,

ThemesBazar.Com

বিদেশে মেয়ের ওপর যৌন নির্যাতন দিশেহারা বাবা

Spread the love

মেয়েটির বয়স ১৯ বছর। কিন্তু পাসপোর্টে তাঁর বয়স ২৮ বছর। এই তরুণী অবিবাহিত। তবে পাসপোর্টে তিনি বিবাহিত। স্বামীর নামের ঘরে নিজের নানার নাম। ময়মনসিংহ থেকে পাসপোর্ট বানিয়ে দেওয়াসহ সব কাজই করেছে একটি দালাল চক্র। তারপর সরকারি নিয়মকানুনের মধ্যেই মেয়েটি সৌদি আরবে পা বাড়ান গত ১১ ফেব্রুয়ারি। এরপর থেকেই মেয়েটি যৌন ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

কেরানীগঞ্জ থেকে তরুণীটির বাবা একবার দালাল, একবার থানা, একবার গণমাধ্যম, ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে মেয়েকে দেশে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানাচ্ছেন। বাড়ি ফিরে অন্য আত্মীয়দের জানাচ্ছেন, মেয়ে বিদেশে ভালো আছেন। তা না হলে মেয়ে দেশে ফিরলে তো আর তাঁকে বিয়ে দিতে পারবেন না।

সম্প্রতি কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে বসে তরুণীর বাবা বলেন, ‘মেয়ের জন্য তো কানতেও পারতেছি না। আমার আব্বুটা (মেয়ে) কত কষ্ট পাইতেছে। ওরে জন্তু-জানোয়ারের মতো মারতাছে। শুধু বাঁচতে চায় আমার আব্বু। আমি তো কোনো আশ্বাসও দিতে পারি না। ফোন করলে তো কথাও বলতে পারি না।’

মেয়েকে দালালদের মাধ্যমে বয়স বাড়িয়ে (সরকারের নিয়ম অনুযায়ী সৌদি আরবে কাজের জন্য যেতে বয়স হতে হয় ২৫ বছর) এভাবে বিদেশ পাঠিয়ে এখন অনুতপ্ত এই বাবা। তিনি বললেন, ‘দালালেরাই তাঁকে বুঝিয়েছেন, মেয়ে ভালো চাকরি করবে। মেয়ে দেশে এক কাপ চাও বানিয়ে খায়নি, ওই মেয়েকে বাসাবাড়ির কাজে দিয়েছে। আর মেয়ে শুধু এখন বলছে, তার সঙ্গে অনেক খারাপ ব্যবহার করা হচ্ছে, যা মেয়ে হয়ে বাবার কাছে ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।’

এইচএসসি পাস করা ওই তরুণীর সঙ্গে প্রথম আলোর প্রতিবেদকের টেলিফোনে কথা হয়। কান্নাজড়িত কণ্ঠে এবং ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে দ্রুত তিনি বলেন, তিনি খুব খারাপ অবস্থার মধ্যে আছেন। বর্তমানে যেখানে আছেন, সেখানে ১০ থেকে ১২ জন পুরুষ থাকেন। সারা দিন প্রচণ্ড কাজের চাপ। এর সঙ্গে চলে যৌন নির্যাতন। সব মিলিয়ে তাঁর কাছে এক সেকেন্ড সময়কেও অনেক দীর্ঘ মনে হচ্ছে।

প্রথম আলোর সংগ্রহে থাকা মেয়েটি এক ভিডিও বার্তায় তিনি কিস্তি থেকে টাকা উঠিয়ে হলেও তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য পরিবারের সদস্যদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। যেমন করে হোক, তাঁকে বাঁচানোর আকুতি জানিয়েছেন। ভিডিও বার্তায় মেয়েটি বলেছেন, ‘আমি মইরা যামু। জানে কুলাইতেছে না। সহ্য করতে পারতেছি না। জীবনটা ছেলেখেলা না। আমি বাঁচতে চাই, বাঁচাও…।’

মেয়েটির বাবার দেওয়া তথ্য এবং গত ২৮ মার্চ কেরানীগঞ্জ থানায় বাবার করা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) অনুযায়ী, সাভারের হেমায়েতপুরের গ্রামীণ ট্রাভেলসের মালিক আবুল কাশেম মেয়েটিকে বিদেশ পাঠানোর ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করেন। আবুল কাশেম বর্তমানে ওমরা হজ পালন করতে সৌদি আরবে রয়েছেন।

গ্রামীণ ট্রাভেলসের পরিচালক রফিকুল ইসলাম বাবু টেলিফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের মালিক দেশে ফিরেই মেয়েটিকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেবেন। আমরা মাসে ১০ থেকে ১২ জন নারী-পুরুষকে বিদেশ পাঠাচ্ছি। কিন্তু খাদ্দামা ভিসায় যাওয়া এই মেয়েটিই খারাপ জায়গায় পড়েছে। এই মেয়ের বয়স কম ছিল, পাঠানোর আগেই মেয়েটির বাবাকে বলেছিলাম, তখন বাবা কান্নাকাটি করে বলেছেন, বয়স বেশি দেখিয়ে হলেও যাতে পাঠানো হয়।’

রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মেয়েটিকে দুই বছরের চুক্তিতে বিদেশ পাঠানো হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী দেশে ফিরিয়ে আনার টাকা মেয়ের পরিবারের দেওয়ার কথা। মেয়েটির বাবাকে অর্ধেক টাকা দিতেও বলা হয়েছিল। কিন্তু টাকা না দিয়ে ওই বাবা থানায় জিডি করেছেন, সাংবাদিকদের কাছেও গেছেন। তাই এখন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেই মেয়েটিকে ফিরিয়ে আনার খরচ বহন করা হবে বলে আলোচনা চলছে।’

নিরাপদে দেশে আনার জন্য ওই তরুণীর বাবা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামে আবেদন করেন। ব্র্যাকের পক্ষ থেকে বিষয়টি জানানো হয় সরকারের ওয়েজ আনার্স কল্যাণ বোর্ডকে। গত ১১ মার্চ এই বোর্ড থেকে মেয়েটিকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে সৌদি আরবের রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেলর (শ্রম) বরাবর চিঠি পাঠানো হয়। এরপরও তাগাদা দিয়ে বোর্ডের পক্ষ থেকে আবার চিঠি পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি নেই বলে জানালেন কল্যাণ বোর্ডের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা। তাঁর মতে, নির্যাতনের শিকার নারীদের ভাগ্য ভালো হলেই এ ধরনের চিঠি পাওয়ার পর দূতাবাস দ্রুত উদ্যোগ নেয়। ভাগ্য খারাপ হলে কত দিনে ওই নারী দেশে ফিরতে পারবেন, তার কোনো গ্যারান্টি দেওয়া সম্ভব হয় না।

বিদেশ যাওয়ার বিভিন্ন কাগজপত্র অনুযায়ী, মেয়েটি ‘টিপিএস ৩৬০ বাংলাদেশ’ নামে একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরব যান। এই এজেন্সির ব্যবস্থাপক মো. রুবেল বলেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই মেয়েটি সৌদি আরবে গেছেন। তবে তিনি নির্যাতনের শিকার—এ নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ করা হয়নি। অভিযোগ করলে তাঁরা বিষয়টি দেখবেন।

এ বিষয়ে মেয়েটির বাবা বলেন, ‘তিনি দালাল কাশেমের পা পর্যন্ত ধরেছেন মেয়েকে দেশে আনার জন্য। তিনি কাশেমের প্রতিষ্ঠান ও বাড়ি ছাড়া আর কোনো প্রতিষ্ঠানের কাউকে চেনেন না, যারা তাঁর মেয়ের বিদেশ যাওয়ার সঙ্গে জড়িত ছিল।’

মেয়েটির বাবা বলেন, তাঁর এক ছেলে থাকলেও মেয়েটিকে বেশি ভালোবাসেন। আদর করে মেয়েকে ‘আব্বু’ ডাকেন। মেয়েকে দেশে ফিরিয়ে আনতে না পারলে তাঁর আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কিছু করার থাকবে না।

Print Friendly, PDF & Email

ThemesBazar.Com

      আরো পড়ুন