গরিবের কম্বলে দুর্নীতির থাবা

গরিবের কম্বলে দুর্নীতির থাবা

ফেব্রুয়ারি ২২, ২০১৮ 0 By admin
Spread the love

৬১২ টাকা পিসের উলের কম্বলের পরিবর্তে দেয়া হয়েছে নিম্নমানের কম্বল * ৩০ কোটি টাকার কাজে মোটা অঙ্কের অর্থ লোপাটের আশঙ্কা * পদস্থ কর্মকর্তার ফোনালাপে দুর্নীতির ভয়াবহ তথ্য : ‘আবদুর রহমানের (উপসচিব) কোনো ভয় নেই। তিনি টাকা খেয়ে বুঁদ হয়ে আছেন। মাল (টাকা) নিয়েই যাচ্ছেন। তাকে কঠিন ভয় দেখিয়েও কাজ হয়নি।’

 

  আহমদুল হাসান আসিক ও নুরুল আমিন:

 

দুস্থ ও গরিবের জন্য কম্বল কেনায় গুরুতর অনিয়ম হয়েছে। ক্রয় শর্ত লঙ্ঘন করে সরবরাহ করা হয়েছে খুবই নিম্নমানের কম্বল। দরপত্রে প্রতি পিসের দাম ৬১২ টাকা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে তা ২শ’ টাকাও হবে না। শতভাগ উলের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় নিম্নমানের সুতা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে এভাবে চলতি অর্থবছরে ৩০ কোটি টাকার কম্বল সরবরাহে গোপন দফারফা হয়। অভিযোগ উঠেছে, এখানে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগসাজশ করে বড় ধরনের দুর্নীতি হয়েছে। যার কমিশন ভাগাভাগি হয়েছে বিভিন্ন স্তরে।

তথ্যানুসন্ধানে আরও জানা যায়, পৃথক নামে কাজ পেলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দুটির মালিক একজনই। ভাগ্যবান এই ঠিকাদারের নাম আকাশ ভৌমিক। তার প্রতিষ্ঠান দুটি হল প্রভাতী এন্টারপ্রাইজ ও তালুকদার এন্টারপ্রাইজ। বাড়ি চাঁদপুরের মতলব উপজেলায়। এছাড়া শুধু চলতি অর্থবছর নয়, এর আগেও তিন দফায় কম্বল সরবরাহের কাজ পেতে সক্ষম হয় একই প্রতিষ্ঠান। রহস্যজনক কারণে একই ব্যক্তি বারবার কাজ পাচ্ছে। আর তার বিরুদ্ধে নিম্নমানের কম্বল সরবরাহের অভিযোগ এই প্রথম নয়, এর আগেও ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রভাবশালী মহলের তদবিরে তিনি পার পেয়ে যান। এভাবেই সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার মাত্র চার বছরের ব্যবধানে সামান্য মুদি দোকানদার থেকে হয়ে যান ক্রোড়পতি। এক সময় যার নুন আনতে পান্তা ফুরাত, তিনি এখন কোটি কোটি টাকার মালিক।

এ বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহ কামাল যুগান্তরকে বলেন, ‘ত্রাণের কম্বল কেনার বিষয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের মহাপরিচালক জানেন। তার সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের মহাপরিচালক রিয়াজ আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ‘এখনও আমরা লিখিত কোনো অভিযোগ পাইনি। তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে বিষয়টি জানতে পেরেছি। এ কারণে বিল আটকে দেয়া হয়েছে। এছাড়া কম্বলগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই বিল ছাড়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।’

অভিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এর আগে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল- এ বিষয়ে জানতে চাইলে মহাপরিচালক রিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘এ নিয়ে তদন্ত হয়। এরপর অব্যাহতি পায়। এজন্য সে পুনরায় দরপত্র কেনার সুযোগ পেয়েছে।’

এদিকে যুগান্তরের অনুসন্ধানে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে রীতিমতো সাপ বেরিয়ে আসে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের জনৈক পদস্থ কর্মকর্তার ফোনালাপে নিম্নমানের কম্বল কেনার আসল রহস্য বেরিয়ে পড়ে। যুগান্তরের হাতে আসা এ সংক্রান্ত একাধিক ফোনালাপে এক পদস্থ কর্মকর্তা অপর প্রান্তের ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, ‘আহা! গরিব মানুষের কম্বলরে ভাই। কম্বলে এক ছটাক উল নেই। থাকার কথা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ উল। কম্বলের ওজন হওয়ার কথা দুই কেজি ৩৩৫ গ্রাম। বাস্তবে আছে এক কেজি ৭০০ থেকে এক কেজি ৯০০ গ্রাম। নিম্নমানের কম্বল সরবরাহ করে এখন গোডাউনের (গুদাম) কিপারদের চাপ প্রয়োগ করছে তার পক্ষে (আকাশ ভৌমিক) প্রতিবেদন দেয়ার জন্য। সবাইকে (সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের) ভাগ দিয়েছেন। তিন লটে ৩০ কোটি টাকার কম্বল সরবরাহ করেছেন। রিসিভ কমিটির দু’জন আমাকে বলেছেন, স্যার কোনোভাবে বিলটা আটকে দেয়া যায় না। আমি বলেছি দেখি। আমি কী করব ভাই। সবাই তো এখানে ম্যানেজ হয়ে আছেন।’

রিসিভিং কমিটির প্রধান উপসচিব আবদুর রহমান সম্পর্কে ওই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ফোনালাপে অপর প্রান্তের ব্যক্তিকে বলেন, ‘আবদুর রহমানের কোনো ভয় নেই। তিনি টাকা খেয়ে বুঁদ হয়ে আছেন। মাল (টাকা) নিয়েই যাচ্ছেন। তাকে কঠিন ভয় দেখিয়েও কাজ হয়নি।’

এ কারণে ওই পদস্থ কর্মকর্তা কিছু করতে পারছেন না বলেও নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন টেলিফোনের অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তির কাছে।

ঠিকাদার আকাশ ভৌমিক সম্পর্কে ওই পদস্থ কর্মকর্তা মুঠোফোনে আরও বলেন, ‘এমন অসভ্য লোক আমি জীবনে দেখিনি। রাস্তার লোক, মুদি দোকানদার ছিল।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের পরিচালক (ত্রাণ) ইফতেখারুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘আকাশ ভৌমিক বলেছেন, তিনি রাজনীতি করেন। বিষয়টি তিনি রাজনৈতিকভাবে সমাধান করবেন। তাছাড়া কম্বল গুদামে ঢোকানোর আগে তা বুঝে নেয়ার দায়িত্ব রিসিভিং কমিটির। তারা একটি প্রতিবেদন দেবে। আমরা তো আর মালামাল পরীক্ষা করি না। তারা পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেবে। আর এ ধরনের অভিযোগ থাকলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’

গরিবের কম্বলে দুর্নীতির এমন ঘটনা অনুসন্ধানে নেমে জানা যায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের একজন কর্মকর্তা নিম্নমানের একটি কম্বল জব্দ করেছেন। কিন্তু রোষানলে পড়ার ভয়ে তিনি প্রকাশ্যে মুখ খুলতে পারছেন না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, জব্দ করা ওই কম্বলটির ওজন এক কেজি ৬০০ গ্রাম। অথচ ক্রয় শর্ত অনুযায়ী কম্বলের ওজন হওয়ার কথা দুই কেজি ৩৩৫ গ্রাম। এছাড়া কম্বলে উলের কোনো অস্তিত্ব নেই। উলের বদলে ব্যবহার করা হয়েছে পাটের নিম্নমানের সুতা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আকাশ ভৌমিকের মালিকানাধীন প্রভাতী এন্টাপ্রাইজ ও তালুকদার এন্টারপ্রাইজ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তিন দফায় ৩০ কোটি টাকার কম্বল সরবরাহের দায়িত্ব পায়। সেই কম্বল ২৭ জানুয়ারি থেকে পরবর্তী দুই সপ্তাহে রাতের আঁধারে তেজগাঁওয়ের কেন্দ্রীয় খাদ্য গুদামের (সিএসডি) ত্রাণ শাখায় কোনো ধরনের পরীক্ষা ছাড়াই ঢুকেছে। এভাবে নিম্নমানের এবং ব্যবহার অনুপযোগী কম্বল গ্রহণ করায় এ নিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর সূত্র জানায়, সরবরাহকৃত কম্বল প্রতি পিস ওজনে দুই কেজি ৩৩৫ গ্রাম হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা এক কেজি ৭০০ গ্রাম থেকে ২ কেজি। আর দৈর্ঘ্য হবে ৯৪ ইঞ্চি এবং প্রস্থ হবে ৬৪ ইঞ্চি। এক্ষেত্রেও অনিয়ম করা হয়েছে। অর্থাৎ আকাশ ভৌমিকের প্রতিষ্ঠান দুটি এসব শর্তের মধ্যে কোনোটিই পূরণ করেনি।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর থেকে এ বিষয়ে জারি করা নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সমন্বয়পূর্বক যদি দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও ওজন শর্তের পরিমাপের চেয়ে বেশি হলে গ্রহণযোগ্য হবে। কিন্তু কম হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না এবং কম্বল এক পার্টের হতে হবে। অথচ অধিদফতরের এমন নির্দেশনার তোয়াক্কা না করেই নিম্নমানের ও কম ওজনের কম্বল গ্রহণ করেছে সিএসডির ত্রাণ শাখা।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, কম্বল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গ্রহণ করতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে একটি রিসিভিং কমিটি গঠন করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু রিসিভিং কমিটির প্রধান উপসচিব আবদুর রহমান মোটা ও নিম্নমানের কম্বল গ্রহণ করেছেন। তাকে মহাপরিচালক (রিয়াজ আহমেদ) ডেকেছিলেন। মহাপরিচালক এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাও করেছেন। জবাবে আবদুর রহমান বলেছেন, এ বিষয়ে সব দায়িত্ব তার। এতে প্রমাণিত হয়, তিনি ব্যক্তিস্বার্থে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগসাজশ করে এহেন অনিয়ম, দুর্নীতি করেছেন। তারা আশঙ্কা করছেন, কম্বল কেনার বেশির ভাগ টাকা লুটপাট করা হয়েছে।

এদিকে এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিএসডির ত্রাণ শাখার গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাজনীন শামীমা যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি ত্রাণ শাখার গুদাম তদারকির দায়িত্বে আছি। তবে সরবরাহ করা মালামাল পরীক্ষা করে প্রবেশ করানোর দায়িত্ব রিসিভিং কমিটির। তারা ভালো বলতে পারবেন।’

জানতে চাইলে কমিটির রিসিভিং কমিটির প্রধান উপসচিব আবদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কমিটিতে আরও কয়েকজন সদস্য রয়েছেন। এখন এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। পরবর্তী সময়ে পরীক্ষা করে জানতে পারব।’ নিম্নমানের কম্বল, ওজনে ঠিক নেই, উলের বদলে পাটের আঁশ ব্যবহার করা হয়েছে- এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো কথা বলতে চাননি।

এদিকে রাতের আঁধারে নিম্নমানের কম্বল সরবরাহ করা হয়েছে এমন একটি অভিযোগ সম্প্রতি জমা পড়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মস্ত্রণালয়ের সচিবের দফতরে। অভিযোগে বলা হয়, চাহিদা পত্রের স্পেসিফিকেশনের বাইরে নিম্নমানের বস্তা পচা কম্বল সরবরাহ করে কয়ক বছর ধরে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে আকাশ ভৌমিকের মালিকানাধীন প্রভাতী এন্টারপ্রাইজ ও তালুকদার এন্টারপ্রাইজ। তাদের সরবরাহ করা নিম্নমানের এবং কম ওজনের কম্বল কোনো আপত্তি ছাড়াই গ্রহণ করছে ত্রাণ শাখা।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রভাতী এন্টারপ্রাইজ ও তালুকদার এন্টারপ্রাইজের মালিক আকাশ ভৌমিক যুগান্তরকে বলেন, ‘ওজন এবং মান নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে এমন পরিস্থিতি আছে বলে মনে হয় না।’ এর আগেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অভিযোগটির সত্যতা পায়নি মন্ত্রণালয়।’

সংশ্লিষ্টরা জানান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া দুর্নীতি রোধে আন্তরিক হলেও কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার অসহযোগিতার কারণে তিনি কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছেন না। তবে তাদের খুঁটির জোর কোথায় সেটিই এখন জানার বিষয়।- যুগান্তর

এই সম্পর্কীও খবর

Recent Posts