,

ThemesBazar.Com

‘পিতার সামনেই বিউটিকে হত্যা করে ময়নাসহ দুই ঘাতক’

Spread the love

১৬ মার্চ রাতে লাখাই উপজেলার গুণীপুর গ্রামের নানাবাড়ি থেকে বিউটিকে রাত সাড়ে ১২টার দিকে তার বাবা সায়েদ আলী নিয়ে আসেন। পরে রাস্তায় অপেক্ষমাণ ময়না মিয়াসহ ভাড়াটে খুনির হাতে বিউটিকে তুলে দেন তিনি।

 হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে আলোচিত কিশোরী বিউটি আক্তার হত্যার ঘটনায় তার পিতা সায়েদ আলী আদালতে চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন। তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন কন্যা হত্যার সঙ্গে তার জড়িত থাকার কথা। হত্যার রাতে নিজেই নানার বাড়ি থেকে নিয়ে এসে বিউটিকে তুলে দেন খুনিদের হাতে এবং তার চোখের সামনেই হত্যা করা হয় বিউটিকে।

এ নিয়ে ৭ এপ্রিল, শনিবার বিকাল সাড়ে ৫টায় হবিগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন পুলিশ সুপার বিধান ত্রিপুরা। এ সময় তিনি জানান, শায়েস্তাগঞ্জের আলোচিত কিশোরী বিউটি আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার রহস্য উদঘাটন হয়েছে। প্রথম দফায় দায়ের করা ধর্ষণ মামলার সাক্ষী নিহত বিউটির নিকটাত্মীয় চাচা ময়না মিয়া ধারালো অস্ত্র দিয়ে বিউটিকে হত্যা করে। তাকে সহযোগিতা করে বিউটির পিতা সায়েদ আলীসহ ভাড়াটে এক খুনি।

গত ১৬ মার্চ রাতে লাখাই উপজেলার গুণীপুর গ্রামের নানাবাড়ি থেকে বিউটিকে রাত সাড়ে ১২টার দিকে তার বাবা সায়েদ আলী নিয়ে আসেন। পরে রাস্তায় অপেক্ষমাণ ময়না মিয়াসহ ভাড়াটে খুনির হাতে বিউটিকে তুলে দেন তিনি। লাখাই উপজেলার সীমান্তবর্তী হরিণখলা এলাকায় রাত ৩টার দিকে ভাড়াটে খুনির সহায়তায় ময়না মিয়া তার হাতে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে বিউটির পেটসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে হত্যা করেন। পরে রাত ৪টার দিকে ময়না মিয়া কাঁধে করে বিউটির লাশ পুরাইকলা হাওড়ে নিয়ে ফেলে দেন।

পুলিশ সুপার আরও জানান, গত ২৮ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণডুরা ইউপি নির্বাচনে বাবুলের মা কলম চান বিবির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ময়না মিয়ার স্ত্রী আসমা আক্তার। এতে কলম চান বিবি জয়ী হন। নির্বাচনের আগে কলম চান বিবিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করতে বারণ করেন ময়না মিয়া। কিন্তু কলম চান তা না শুনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হন। মূলত এ আক্রোশ থেকেই কলম চান বিবিকে ঘায়েল করতে পরিকল্পনা করতে থাকেন ময়না মিয়া। শুধু নির্বাচনী বিরোধ নয়, কলম চান বিবি ও বাবুলের সহায়-সম্পত্তি আত্মসাতেরও পরিকল্পনার অংশ ছিল তাদের। গত ১ এপ্রিল বাবুলকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার পর তাদের ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়।

গত ৪ এপ্রিল বিউটির নানি ফাতেমা বেগমকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে আসে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ বিউটি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। ৫ এপ্রিল ধর্ষণ মামলার সাক্ষী ময়না মিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে পুলিশ। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ময়না মিয়া প্রাথমিকভাবে হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। পরে ৬ এপ্রিল বিউটির পিতা সায়েদ আলীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে পুলিশ। তিনিও প্রাথমিকভাবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন।

পুলিশ ৬ এপ্রিল বিউটি হত্যা মামলার মূল ঘাতক ময়না মিয়াকে আদালতে হাজির করে। এ সময় ময়না মিয়া হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দেন।। একই দিন বিউটি ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে মামলার অন্যতম আসামি বাবুল আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দেন এবং বিউটির নানি সাক্ষী ফাতেমা বেগমের জবানবন্দী আদালত রেকর্ড করে।

৭ এপ্রিল সকাল ১০টায় মামলার বাদী বিউটির পিতা সায়েদ আলী আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দেন। এ সময় তিনি কন্যা হত্যার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। একই দিন হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি ময়না মিয়ার স্ত্রী আসমা আক্তার সাক্ষী হিসেবে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দেন। তিনিও আদালতে বিউটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার স্বামী ময়না মিয়ার সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন।

হবিগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিউটি হত্যাকাণ্ডের সবিস্তার বর্ণনা করছেন পুলিশ সুপার বিধান ত্রিপুরা। ছবি: প্রিয়.কম

পুলিশ সুপার আরও জানান, অলিপুরে অবস্থিত প্রাণ কোম্পানির অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারভাইজার ছিলেন বাবুল। অন্যদিকে প্রাণ কোম্পানিতে শ্রমিকের কাজ করতেন বিউটির মা জোসনা বেগম। সে সুবাদে জোসনার মেয়ে স্থানীয় মোজাহের উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী বিউটির সঙ্গে বাবুলের পরিচয় হয়। পরে তাদের মাঝে গড়ে ওঠে প্রেমের সম্পর্ক।

গত ২১ জানুয়ারি বিউটি আর বাবুল পালিয়ে অলিপুর স্কয়ার কোম্পানির পাশে একটি ঘর ভাড়া নেন এবং ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অবস্থান করেন। এ সময়ের মধ্যে দুজনের মাঝে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিষয়টি বিউটির মা জানতে পেরে সেখান থেকে বিউটিকে নিয়ে আসেন। পরে স্থানীয় মুরব্বি জালাল মিয়ার বাড়িতে রেখে বিষয়টি সামাজিকভাবে মীমাংসা করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু মীমাংসা না হওয়ায় হবিগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে বাবুল ও তার মা কলম চান বিবির বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন বিউটির পিতা সায়েদ আলী। আদালত মামলাটি রুজু করতে শায়েস্তাগঞ্জ থানাকে নির্দেশ দিলে ৪ মার্চ মামলা রেকর্ড করা হয়।

এদিকে বিউটি শারীরিকভাবে অসুস্থ হলে তাকে হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা করানো হয়। মেডিকেল পরীক্ষার পর বিউটিকে তার নানার বাড়িতে রেখে আসা হয়। এরপর অপহরণ ও ধর্ষণ মামলাটি আপোসে সমাধানের জন্য স্থানীয়ভাবে বেশ কয়েকবার সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সমাধান হয়নি। আর এ সুযোগটি কাজে লাগাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন ময়না মিয়া। সায়েদ আলীকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখানোসহ পরামর্শ দিতে থাকেন। ময়না মিয়া তখন সায়েদ আলীকে বলেন, তার মেয়ে কলঙ্কিত হয়ে গেছে। আরও দুই মেয়ে রয়েছে, তাদের কথা চিন্তা করা লাগবে। এ সময় সায়েদ আলীকে মোটা অঙ্কের টাকার প্রলোভনও দেখানো হয়। এরই অংশ হিসেবে গত ১৬ মার্চ রাতে নানার বাড়ি থেকে বিউটিকে নিয়ে আসেন সায়েদ আলী এবং তুলে দেন খুনিদের হাতে। তার চোখের সামনেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার কন্যাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে ময়না মিয়া ও ভাড়াটে খুনি। তখনো বিন্দুমাত্র মন গলেনি সায়েদ আলীর। এরপর গত ১৭ মার্চ গুণীপুর থেকে চার কিলোমিটার দূরে পুরাইকলা হাওড়ে তার মরদেহ পাওয়া যায়। তার শরীরের একাধিক স্থানে পাঁচটি আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

এ ঘটনায় গত ১৮ মার্চ বিউটির পিতা সায়েদ আলী বাদী হয়ে একই গ্রামের বাবুল মিয়া (৩২) ও তার মা ইউপি সদস্য কলম চান বিবিকে (৪৫) আসামি করে শায়েস্তাগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। এরপর অভিযান চালিয়ে কলম চান বিবিকে শায়েস্তাগঞ্জ নতুন ব্রিজ এবং বাবুলের বন্ধু ইসমাইল মিয়াকে অলিপুর থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গত ৩০ মার্চ সিলেট থেকে গ্রেফতার করা হয় বাবুল মিয়াকেও। হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। প্রতিবাদের ঝড় ওঠে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ গণমাধ্যমে। ধর্ষণ ও হত্যায় জড়িতদের শাস্তির দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে সারা দেশ।

পুলিশও হত্যার মোটিভ উদঘাটনে মরিয়া হয়ে ওঠে। প্রথম দফায় তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করা হয়। বদল করা হয় তদন্তকারী কর্মকর্তা। দ্বিতীয় দফায় চাঞ্চল্যকর মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পান শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) মানিকুল ইসলাম। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার এক সপ্তাহের মাঝেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে সক্ষম হন।

৭ এপ্রিল, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল ইসলামের আদালতে বিউটির পিতা সায়েদ আলীর জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়। দীর্ঘ সময়ের এ জবানবন্দীতে তিনি হত্যার আদ্যোপান্ত সম্পর্কে আদালতে বর্ণনা দেন। একই দিন বিকেলে হত্যাকাণ্ডের অন্যতম হোতা ময়না মিয়ার স্ত্রী আছমা আক্তার সাক্ষী হিসেবে আদালতে জবানবন্দী দেন।

এর আগে ৬ এপ্রিল শুক্রবার রাতে বাবুল মিয়া ও ময়না মিয়া আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন। এদিন নিহত বিউটির নানি ফাতেমা বেগম সাক্ষী হিসেবে আদালতে জবানবন্দী দেন। জবানবন্দীতে ময়না মিয়া হত্যাকাণ্ডের কথা এবং বাবুল ধর্ষণের কথা স্বীকার করেন। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত মোট চারজনকে গ্রেফতার দেখিয়েছে পুলিশ।

Print Friendly, PDF & Email

ThemesBazar.Com

      আরো পড়ুন