বাচ্চাটা একটা খেলনা ফোন চেয়েছিল

বাচ্চাটা একটা খেলনা ফোন চেয়েছিল

জুনe ১২, ২০১৮ 0 By admin
Spread the love

মোফাজ্জল করিম:মহিলার বয়স সত্তরের বেশিই হবে, কম হবে না। মাথার প্রায় সব চুলেই পাক ধরেছে, পলিতকেশীই বলা চলে। ওপরের পাটির দাঁত সবই পড়ে গেছে, আছে শুধু দুটো, যেন স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, এককালে এই গৌরকান্তি মহিলা সুদতীও ছিল। কোনো দিন হয়তো তার একটা নাম ছিল, সেই নামে মা-বাবা, পাড়া-প্রতিবেশী তাকে ডাকত, এখন তাকে সবাই চেনে, সবাই ডাকে মতির মা বলে। মতির মা বুয়া। ২০-২৫ বছর ধরে এই পাড়ায় সে বুয়ার কাজ করে। সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা তিন শিফটে তার কাজ। স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকেই তাকে এই কাজ করতে হয়।

বেলা এগারোটার দিকে কলিংবেলের আওয়াজ শুনে দরজা খুলতেই দেখি মতির মা। আজ তার আসতে যথেষ্ট দেরি হয়েছে। এমনিতে সকাল আটটার ভেতরই চলে আসে সে। কী ব্যাপার, আজকে এত দেরি যে? গলার স্বরে বিরক্তি মিশিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। বলতেই সে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল—খালু (আমার মেয়ে অর্থাৎ তার মনিব, তার সাত ছোট হলেও তাকে সে ডাকে আপা, সেই সুবাদে আমি খালু), আমার উপরে বড় বিপদ নাযিল অইছে। আমার ছোট নাতিটার হাত ভাঙ্গি গেছে। তারে লইয়া ডাক্তরর কাছে গেছলাম। ডাক্তার বেন্ডিজ বান্ধি দিছে। এখন বাচ্চাটা খালি কান্দে। বলে সে নিজেই কাঁদতে লাগল।

তাকে সান্ত্বনা দিয়ে পুরো ব্যাপারটা জানতে চাইলাম। সে যা বলল তা এই। তারা এক বস্তিতে দুটো কামরা নিয়ে থাকে। সে, তার ছেলে, ছেলের বউ ও দুটি নাতি-নাতনি। ছেলে মতি রিকশা চালায়, আর তার বউও চার বছরের নাতিটিকে পাশের ঘরের বউ-ঝিদের জিম্মায় রেখে কোলেরটিকে নিয়ে সকালবেলা বুয়ার চাকরিতে চলে যায় এক বাসায়, ফেরে দুপুরের পর। মতি সারা দিন রিকশা চালিয়ে ঘরে ফিরতে ফিরতে রাত হয়। এসে রোজই দেখে, বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়েছে। গত রাতে নাকি ঘরে ফিরে দেখে, ছেলেটা কাঁদছে ভ্যা ভ্যা করে। কী ব্যাপার? না, সে বায়না ধরেছে, একটা মোবাইল ফোন তাকে কিনে দিতেই হবে। আশপাশের সব বাচ্চার মোবাইল ফোন আছে, তার নেই। কদিন ধরেই সে ঘ্যান ঘ্যান করছে এ জন্য। তার মা তাকে বুঝিয়েছে, বাবা এলেই বলবে তাকে একটা মোবাইল ফোন কিনে দিতে, এখন লক্ষ্মী ছেলের মতো খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে থাকো। ছেলে শুনবে না। না, এখনু আনি দেও। বাবায় কিচ্ছু দ্যায় না, বাবারে কইয়া কিচ্ছু অইত নায়। মতিও তাকে অনেক বোঝায় : কাইল তুমারে একটা লাল টুকটুক মোবাইল কিনি দিমু। এখন ভাত খাও, খাইয়া ঘুমাও। কিন্তু সে কিছুতেই কান্না থামায় না। একপর্যায়ে সারা দিনের রোজায় ক্লান্ত মতি রেগে গিয়ে একটা চেলা কাঠ তুলে দিল এক বাড়ি ছেলেকে। ছেলে হাত তুলে ওটা ঠেকাতে গিয়ে…। সারা রাত বাচ্চাটা যন্ত্রণায় চিৎকার দিয়েছে। রাত পোহাতেই মতি ও তার মা রিকশা করে তাকে নিয়ে ছুটেছে হাসপাতালে। ‘ডাক্তর এক্স-রে করি দেখিয়া কইছন একটা আড্ডি ভাঙ্গি গেছে।’ বলেই বুড়ি আবার ডুকরে কেঁদে ওঠে।

‘কিন্তু ওইটুকু বাচ্চা মোবাইল ফোন দিয়ে কী করবে? সে কি কখনো দেখেছে মোবাইল ফোন?’ আমি জানতে চাই। ‘না, খালু—এইটা আসল মবাইল নায়, খেলনা। বাইচ্চারা ওউটা নিয়াই মবাইল-মবাইল খেলে।’ শুনে আমি বললাম, ‘তা তোমরা ওকে একটা খেলনা মোবাইল ফোন কিনে দিলেই পারো। কতই দাম হবে ওটার, বড়জোর আট-দশ টাকা।’ মতির মা বলল, ‘আমরার লাগি দশ টেকা অনেক টেকা রে বাবা। মাসো মাসো গরবাড়া দিত অয় আট আজার টেকা। তারপর আছে সংসারর খায়-খরচ। আমরা পইতেতকটা পয়সা হিসাব করি চলি। কুনুমতে ডাইল-বাত আর হুটিক পুড়া খাইয়া দিন যায়। অউযে নাতিটার আত বাঙ্গল এখন কিতা অইব। আইজউ তে বারই গেল পাঁচ-ছয় শ টাকা। পুয়ায় কর্জ করিয়া টেকা যুগাড় করছে। সামনে ঈদ। আর কিচ্ছু না অউক বাইচ্চাইনতরে, তারার মারে, ত বছরো একবার অইলেও এক-আধটা নয়া কাপড় দিত অইব। দশ টেকা দি মবাইল ফন কিনার খুয়াব কুনু আর আমরা দেখতাম পারি নি?’

শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। একটা পরিবারের তিনটি প্রাণী সবাই উদয়াস্ত পরিশ্রম করে। একজনের বয়স সত্তর বা সত্তরোর্ধ্ব। তাকেও সারা দিন এবাড়ি-ওবাড়ি খেটে রান্নাবাড়া করে, হাঁড়ি-পাতিল ধুয়ে, কাপড় কেচে, ঘর-দুয়ার মুছে অন্নসংস্থান করতে হয়। অথচ এই বয়সে তার দিনরাত শুয়ে-বসে আল্লাহ-বিল্লাহ করে, তসবিহ জপে সময় কাটানোর কথা। নাতিপুতিদের সঙ্গে আনন্দে হাসি-গানে কেটে যাওয়ার কথা জীবনের বাকি কটা দিন। সমাজের নিচতলার মানুষদের তো বড় কোনো স্বপ্ন নেই, নেই অনেক অনেক চাওয়া-পাওয়ার হিসাব। তারা দুবেলা দুমুঠো খেতে পারলে, ঈদে-চান্দে দুটি শাড়ি-লুঙ্গি, বাচ্চাদের জন্য চটকদার সস্তা জামা-জুতো পেলেই খুশিতে ভরে ওঠে তাদের মন। আর তাদের সন্তানদের বায়নাও কোনো লেটেস্ট ডিজাইনের শাড়ি-গয়না-লেহেঙ্গা বা ফোর-জি মোবাইল ফোন, দামি মোটরবাইকের বায়না নয়, তাদের চাহিদা মতির মায়ের নাতির দশ টাকা দামের প্লাস্টিকের খেলনা মোবাইল ফোনের মতো অতি তুচ্ছ।

দুই.

আচ্ছা, আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতু, দারুণ প্রেস্টিজিয়াস স্যাটেলাইট, ডবল ডিজিট জিডিপি গ্রোথের দুর্মর আকাঙ্ক্ষা ও মাথাপিছু আয়ের শনৈঃ শনৈঃ প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মতির মায়েদের পরিবারের সুখ-দুঃখের কথাটাও কি আমরা একটু সিরিয়াসলি বিবেচনা করতে পারি না? আজ স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশতাব্দী পর এই মানুষগুলো কেমন আছে? তাদের জীবনটা কি মানবজীবন, না মানবেতর জীবন, তা কি একটিবার ভেবে দেখা যায় না? উত্তরে বলব—হ্যাঁ, যায়, অবশ্যই যায়, অবশ্যই ভেবে দেখা হয়, অন্তত ভেবে দেখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, তবে…। তবে কী? তবে তা চার বছর পর একবার। ওই তখন, যখন দেশে ইলেকশন আসে। তখন সমাজের সব হেভিওয়েট হোমরাচোমরা হুমড়ি খেয়ে পড়েন মতির মাদের বস্তির ঘরগুলোতে। বাবারা-মায়েরা, ভাইয়েরা-বোনেরা, আপনারা একটিবার আমার চিলমচি মার্কায় আপনার মূল্যবান ভোটটি দিয়ে আমাকে দেশসেবার সুযোগ দিন, দেখবেন আপনাদের এই গোরস্থান মার্কা বস্তিকে আমি ফাইভ স্টার হোটেল বানিয়ে দেব (করতালি ও সেই সঙ্গে স্লোগান : আমার ভাই, তোমার ভাই/লাল্লু ভাই, লাল্লু ভাই। লাল্লু তুমি এগিয়ে চলো, আমরা আছি তোমার সাথে। ভোট দিবেন কোথায়? চিলমচি মার্কায় ইত্যাদি।)। লাল্লু ভাই আরো জোশে এসে গিয়ে তখন গলা ফাটিয়ে বলতে থাকেন : আপনাদের এলাকায় একটা ইশকুল নেই, আমি প্রত্যেক মহল্লায় খালি ইশকুল না, একটা করে ইনিভার্সিটি দেবো, আপনাদের হাসপাতাল নেই, আমি প্রত্যেক বাড়িতে বাড়িতে হাসপাতাল দেবো, ছেলেবুড়ো সবার জন্য ফ্রি ইয়াবা সাপ্লাই দেবো, খেয়ে খেয়ে আপনারা মোটাতাজা হবেন, আর আপনাদের লাল্লু ভাইয়ের জন্য দু’আ করবেন।

যা হোক, লাল্লু-পাঞ্জুরা ইয়াবার ব্যবস্থা করতে থাকুন, আমরা ততক্ষণে পরিস্থিতির কন্ডিশন আসলে কী রকম একটু দেখে আসি। এই বস্তিগুলোর মতো হাজার হাজার বস্তি শহরে-বন্দরে গড়ে তুলেছে নদীভাঙন, বন্যা-সাইক্লোনে নিঃস্ব হয়ে পড়া গ্রামের লক্ষ লক্ষ মানুষ। শুধু এরাই নয়, এদের সঙ্গে আছে তাদের সগোত্র আরো অসংখ্য মানুষ, যারা গ্রামের কর্মহীন জীবনে তিলে তিলে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে একদিন খড়কুটোর মতো ভেসে এসে উঠেছে এইসব অন্ধগলির বস্তিতে, ডুবে গেছে নানাবিধ অপরাধের পাপপঙ্কিল জগতে। এদের জীবনে একটু আলো ছড়ানোর জন্য সমাজের ওপরতলার মানুষের কিন্তু চোখে ঘুম নেই। এই এনজিও, সেই এনজিও, এই প্রজেক্ট, সেই প্রজেক্টের ধুম লেগে আছে সেই স্বাধীনতার পর থেকে। কিন্তু ফলাফল? ফলাফল মোটামুটি শূন্যই বলা চলে। বরং দিন দিন এরা রসাতলে যাচ্ছে। আগে হয়তো শুধু ভাতের অভাব, শিক্ষার অভাব, চিকিৎসার অভাব ছিল, আর অপরাধ বলতে ছিল ছিঁচকে চুরি, আর না হয় ছিনতাই। এখন এর সঙ্গে যোগ হয়েছে চোরাকারবার আর মাদকের ব্যবসা। এখানকার উঠতি মাস্তানরা এখন দেশের মাদকসম্রাট- সম্রাজ্ঞীদের সঙ্গে উঠবোস করে। তারা স্বপ্ন দেখে, একদিন তারাও তাদের ‘বস্’দের মতো বিরাট বাড়ি-গাড়ির মালিক হবে, লাল্লু ভাইয়ের মতো ভোটে দাঁড়িয়ে বস্তিতে বস্তিতে গিয়ে ভোট চাইবে চিলমচি-বদনা, হাঙ্গর-কুমির ইত্যাদি মার্কায়।

আর যেসব এনজিও এদের জন্য ‘পায়ের ঘাম মাথায় ফেলে’ দিনরাত পরিশ্রম করছে, তাদের নেতাকর্মীরাও কিন্তু পিছে পড়ে নেই। বস্তিবাসীদের পরিস্থিতির কন্ডিশন যতই খারাপের দিকে যাক, তাঁরা কিন্তু মাশা আল্লাহ দিন দিন ফুলে-ফেঁপে উঠছেন। বিরাট বিরাট জিপগাড়ি ছাড়া তাঁরা চড়েনই না, শহরের সবচেয়ে অভিজাত এলাকাগুলোতে একাধিক বাড়ি ও ফ্ল্যাটের মালিক তাঁরা। শুকুর আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ এই বস্তিগুলো সৃষ্টি করেছিলেন হাজারে হাজারে। নইলে জনসেবা করার সুযোগ কোথায় পাওয়া যেত এই অভাগা দেশে।

শুধু এনজিওরাই যে সমাজসেবা করে করে শহীদ হয়ে গেছে তা নয়, আমাদের সরকারও বসে নেই। স্বাধীনতার পর থেকে সব সরকারই দেশের উন্নয়ন, গ্রামের উন্নয়ন ইত্যাদির পাশাপাশি বস্তির উন্নয়নের দিকেও সমান নজর দিয়ে আসছে। চারদিকে কত উন্নয়ন, কত কাজ! কাজ করতে করতে একেকজন মন্ত্রী-আমলা ‘কেলান্ত’ হয়ে যে একটু বিশ্রাম নেবেন সে সুযোগও নেই। এইসব হতদরিদ্র মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য তাদের কত ছোটাছুটি করতে হয় দেশে-বিদেশে। সেমিনার-সিম্পোজিয়াম-ওয়ার্কশপে যোগ দিতে দিতে তাঁদের প্রাণ ওষ্ঠাগত। দেশের গোরস্থান বস্তির স্বরূপ কী, সমস্যা কী, সমাধান কোথায়—এসব জানতে তাঁদের আজ দিল্লি, তো কাল প্যারিস, পরশু টোকিও-ওয়াশিংটন দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। আহা রে! সত্যি মায়া হয় বেচারাদের দৌড়ঝাঁপ দেখে। আর শুধু একটি-দুটি মন্ত্রণালয় বা মন্ত্রী-সচিব নয়, কাজ করতে করতে রীতিমতো মাজা ভেঙে যাচ্ছে সব মন্ত্রী-আমলার। অবশ্য তাঁদের ‘লুক আফটার’ করার জন্য সরকারও যথাসাধ্য করছে। সরকারের বদান্যতা দাতা হাতেম তাঈকেও লজ্জা দেয়। সরকার মনে হয় তার এই বিশাল কর্মী বাহিনীকে পেলেপুষে আরো বড় করার জন্য ইদানীং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাইরে একটি ‘মোটাতাজাকরণ প্রকল্প’ হাতে নিয়েছে। এরই আওতায় তাদের বেতন-ভাতাই শুধু নয়, সব রকমের সুযোগ-সুবিধা মুক্ত হস্তে দান করার মত দিয়ে যাচ্ছে।

তিন.

আজ থেকে বিশ বছর আগে সচিব হিসেবে আমি বেতন পেতাম সাকল্যে ১৫ হাজার টাকা। আর এখন আমার সৌভাগ্যবান সুযোগ্য উত্তরসূরি পান ৭৮ হাজার টাকা। সেই সঙ্গে বাসায় মতির মার মতো বুয়া দিয়ে কাজ চালালেও এবং একটা ধুতুরা ফুলের গাছ না লাগালেও পাচকভাতা-মালিভাতা পান ৩২ হাজার টাকা। আরো আছে। গাড়ি কেনার জন্য সুদমুক্ত ঋণ ৩০ লাখ টাকা এবং গাড়ির চালক ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবত প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা। বাড়ি কেনার জন্য ৫% সুদে গৃহঋণ পাবেন ৭৫ লাখ টাকা। সরকারি বাড়িতে না থাকলে বাড়িভাড়া পাবেন মাসে ৩৯ হাজার টাকা। এ ছাড়া প্রতি মাসে আছে চিকিৎসাভাতা পনেরো শ টাকা, আপ্যায়নভাতা এক হাজার টাকা, বাচ্চাদের লেখাপড়ার জন্য এক হাজার টাকা। আমার প্রশ্ন, গত বিশ বছরে মূল্যস্ফীতি কি এত বেড়ে গেছে যে তাদের এ রকম আপাতদৃষ্টিতে তোষণমূলক সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে? চাল-ডাল, মাছ-মাংস, শাকসবজি, কাপড়চোপড়, ওষুধপত্র ইত্যাদি কোন জিনিসটার দাম এত বৃদ্ধি পেয়েছে যে একজন কর্মকর্তাকে আগের তুলনায় সাত-আট গুণ বেশি পারিতোষিক দিতে হবে? বেতন-ভাতা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অবশ্যই বাড়াতে হবে। তাই বলে এত নাকি যে তা প্রশ্নবিদ্ধ হবে? আর এটা-ওটার নাম করে এত ভাতাটাতা দিলে বেতনের টাকা দিয়ে তাঁরা কী করবেন? কথাগুলো কোনো অসূয়া থেকে বলছি না, বলছি বাস্তবতার নিরিখে। আর হাত খুলে, দিল খুলে যে টাকাটা দিচ্ছি সে টাকাটা কার? মতির মার মতো দেশের কোটি কোটি মানুষেরই তো, নাকি?

শুরু করেছিলাম একটি শিশুর খেলনা মোবাইল ফোনের বায়না দিয়ে। শেষ করি সরকারের মোবাইল ফোন দিয়ে পৃষ্ঠপোষকতা করার সর্বশেষ অভিঘাতটি দিয়ে। সব মন্ত্রী ও সচিবকে সরকার ‘মাত্র’ ৭৫ হাজার টাকা মূল্যের একটি করে মোবাইল ফোন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অবশ্যই প্রশ্ন উঠবে, কেন? তাঁদের কি মোবাইল ফোন নেই? নাকি ফোন কেনার সামর্থ্য নেই? যে ফোনটি এখন তাঁরা ব্যবহার করেন, সেটিও তো সরকারের দেওয়া। ওটা যে একেবারে ব্যবহার-অযোগ্য তা তো না। ব্যবহারকারীর মত অতটা না হলেও সেটিও তো একটি ‘স্মার্ট’ ফোন বলেই জানি? আর বিল পরিশোধও করবেন গৌরী সেন। যত খুশি, যেখানে খুশি কল করো, কুচ পরোয়া নেহি।

আমাদের সিলেট অঞ্চলে গ্রামে একটা কথা প্রচলিত আছে : হাওরের গরু মামাশ্বশুরকে দান। (সিলেটি ভার্সন হচ্ছে : আওরর গরু মামাহউররে দান)। গল্পটা হচ্ছে, এক লোক শীতকালে হাওরে বিচরণরত শত শত গরুর পাল দেখিয়ে নাকি তার মামাশ্বশুরকে বলেছিল, এই সবগুলো গরু আপনাকে দিয়ে দিলাম, নিয়ে যান। আমাদের মাননীয় সিলেটি অর্থমন্ত্রী নিশ্চয়ই এই প্রবচনটি জানেন। আর এটাও তিনি নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন, জনগণের টাকা হাওরের গরু নয় যে যত্রতত্র যাকে-তাকে দিয়ে দেওয়া যায়।

৭৫ হাজার টাকা নয়—ওটা দুঃস্বপ্ন মতির মায়ের জন্য—৭৫টি টাকাও যদি পেত সে, তাহলে তার নাতিটার প্লাস্টিকের খেলনা মোবাইলের বায়না মেটাতে পারত। যে দেশে একটি বস্তির শিশুর বাবা দশ টাকা দিয়ে একটি খেলনা কিনে দিতে পারে না তার সন্তানকে, আমি মনে করি, সে দেশের একজন বিবেকবান মন্ত্রী বা সচিবের উচিত ৭৫ হাজার টাকার মোবাইল ফোনের অফার প্রত্যাখ্যান করা।

 

লেখক : সাবেক সচিব, কবি

mkarim06@yahoo.com

 

এই সম্পর্কীও খবর

Recent Posts