পুলিশি পাহারার মধ্যেই মাদকের কেনাবেচা

পুলিশি পাহারার মধ্যেই মাদকের কেনাবেচা

জুনe ১০, ২০১৮ 0 By admin
Spread the love

দুপুর পৌনে ১২টা। রেললাইন ধরে দক্ষিণে যেতেই হাতের বাম দিকে থাকা বস্তির একটি ঘরে কিছু লোকের জটলা চোখে পড়ল। কোনো বিষয় নিয়ে তারা আলাপ-আলোচনায় মশগুল। একজনকে আরেকজনের হাতে টাকা গুজে দিতে দেখা গেল। হঠাৎ এ প্রতিবেদককে দেখে নড়েচড়ে বসলেন তারা। কী যেন লুকানোর চেষ্টা তাদের। পরে বস্তির একজন জানালেন, সেখানে ইয়াবা বিক্রি হচ্ছিল, যেটি তাদের কাছে ‘বাবা’ বলে পরিচিত।

গত ৯ জুনের দৃশ্যটি  রাজধানীর গেণ্ডারিয়া এলাকার নামাপাড়া রেলগেটের পাশের বস্তি এলাকার।

‘চলো যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে’ স্লোগানে সারা দেশে যখন মাদকবিরোধী অভিযান চলছে, তখন গেণ্ডারিয়া এলাকায় মাদকের কেনাবেচা থেমে নেই। যেখানে মাদক বিক্রি হচ্ছিল, সেখান থেকে সাত-আট গজ দূরে রেলগেটের দক্ষিণের ফুটপাতে টিনের চালার নিচে বসে থাকতে দেখা গেছে কয়েকজন পুলিশ সদস্যকেও।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, সপ্তাহখানেক আগে অভিযান চললেও মাদক বিক্রি বন্ধ হয়নি। পুলিশি প্রহরার মধ্যেও বস্তির ভেতরে মাদক বিক্রেতাদের ঘরে ইয়াবা বিক্রি হচ্ছে। যারা সরাসরি মাদক বিক্রি করতে পারছেন না, তারা তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের দিয়ে মাদক বিক্রি করছেন।

সরেজমিনে যা দেখা গেছে

নামাপাড়া রেলগেটের দক্ষিণ পাশে গ্লোরি স্কুল। ওই প্রতিষ্ঠান সংলগ্ন ফুটপাতেই কয়েকটি চেয়ার রাখা হয়েছে। তাতে পুলিশ সদস্যরা বসে গল্প করে সময় কাটাচ্ছেন। অন্যদিকে বস্তিতে মাদক বিক্রির বিষয়টিতে যেন পুলিশ সদস্যদের কোনো ধরনের ভ্রুক্ষেপই নেই। অথচ এসব বিষয় দেখভালের জন্য তাদের সেখানে রাখা হয়েছে। পুলিশ সদস্যরা মাঝে মাঝেই উঠছেন ও সিগারেটে টানছেন।

নামাপাড়া রেলগেটের পাশে বসে থাকা দুজন পুলিশ সদস্য (মোটরসাইকেলের পাশে)। ছবি: প্রিয়.কম

৯ জুন শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সেখানে দায়িত্ব থাকা তিন পুলিশ সদস্যের কাউকেই বস্তিতে ঢুঁ মারতে বা তাদের উপস্থিতি জানান দিতে দেখা যায়নি। সেখানে চার ঘণ্টারও বেশি সময় থাকলেও বস্তিতে মাদক বিক্রেতাদের ধরার বিষয়ে কোনো কর্মকাণ্ড চোখে পড়েনি।

ঘুণ্টিঘর এলাকার চিত্র

গেণ্ডারিয়া এলাকায় যে কয়েকটি মাদকের আখড়া রয়েছে, তার মধ্যে নামাপাড়া রেলবস্তি, ঘুণ্টিঘর, একশকাঠা, ভাট্টিখানা ও মিলব্যারাক অন্যতম। নামাপাড়া বস্তিতে থাকা লোকজনের মধ্যে কেউ কেউ হকার বা ফুটপাতে বিভিন্ন খাবার বিক্রির ব্যবসাও করেন।

তবে এই বস্তির সবাই মাদকের সঙ্গে জড়িত নয় বলেও জানান কয়েকজন। রেললাইন ঘরে সামনে গেলেই পাওয়া যাবে ঘুণ্টিঘর। এই এলাকাটিতে কয়েক দিন আগেই মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্তু তারপরও বন্ধ হয়নি মাদকের ব্যবসা।

স্থানীয়দের ভাষ্য

ঘুণ্টিঘরের দক্ষিণ পাশে রেললাইনের ধারে খেলছিল কয়েকটি শিশু, একটু দূরেই যুবকরা দাঁড়িয়ে গল্প করছিলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, অভিযানের পর মাদক বিক্রি কমে গেছে। এলাকায় এককভাবে মাদক বিক্রি করে ‘মাদক সম্রাজ্ঞী’ রহিমা। কিন্তু তার ছেলেরা এলাকা থেকে পালিয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে রুবেল নামের উঠতি এক যুবক। আগের মতো মাদক অন্যরা বিক্রি করতেও পারছে না। বর্তমানে রুবেলের কাছে কোনো ইয়াবার মজুদ নেই।

ওই ব্যক্তির ভাষ্য, রুবেল কমলাপুর থেকে ইয়াবা এনে তা ঘুণ্টিঘরের পাশে দাঁড়িয়ে ফোনে ফোনে গ্রাহককে ডেকে তা বিক্রি করেন। ১০ গজ দূরেই ছিলেন রুবেল ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা। এই প্রতিবেদককে দেখে কী ভেবে মিনিটের মধ্যেই সটকে পড়েন তারা।

ঘুণ্টিঘরের পাশে থাকা রেললাইনের ধারের চিত্র

রেললাইনের কাছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দোকানি জানান, অভিযানের কারণে মাদক ব্যবসায়ীরা দিনের বেলা ঘুমান। তারা সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রেললাইন ছাড়াও ফোনে ফোনে গ্রাহক সংগ্রহ করে ইয়াবা ও গাঁজা বিক্রি করছেন।

গেণ্ডারিয়া এলাকার এক মাদকসেবীর সঙ্গে কথা হয়েছে প্রিয়.কমের। রাজু (ছদ্মনাম) নামের ওই মাদকসেবী জানান, ইয়াবার দাম বেড়ে গেছে। এ কারণে আগে যেখানে একটি ইয়াবা তিনি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় কিনতেন, এখন তাকে ৫০ থেকে ১০০ বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে। আর দিনের বেলা কোনো ইয়াবাই মিলছে না। বস্তিতে বিক্রি হলেও দিনে সেখানে যাওয়াটা কঠিন হওয়ায় অনেক সময় ইয়াবা বিক্রিতে ছোট ছোট শিশুকে ব্যবহার করা হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, নামাপাড়া বস্তিতে রহিমার প্রভাব থাকলেও তিনি এখন গা ঢাকা দিয়েছেন। তার অবর্তমানে এই আখড়াকে নিয়ন্ত্রণ করছেন তার শিষ্য ‘ফর্মা জামাল’। এখন তিনি সবকিছু দেখাশোনা করছেন। এই র্ফমা জামাল দীর্ঘদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সোর্স হিসেবে কাজ করেছেন। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এখন ব্যবসা চালাচ্ছেন তিনি।

অভিযোগ রয়েছে, প্রতি রবিবার করে পুলিশকে পেমেন্টও করা হচ্ছে। বস্তির বিভিন্ন স্পটে যাতে হঠাৎ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্য প্রবেশ করতে না পারেন, সে জন্য পাহারার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। আর এই পাহারার দায়িত্বে রয়েছে শেফালী নামের একজন। এই লোকজনের বিরুদ্ধে গেণ্ডারিয়া থানায় একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। কিন্তু তাদের গ্রেফতার করা হয়নি।

কারা কোন এলাকায় মাদক বিক্রি করছেন

স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, গেণ্ডারিয়া এলাকার নামাপাড়া মসজিদ গলিতে বাবুনি, ফেন্সি শফিক, এলাকার ‘ইয়াবা সম্রাট’ খ্যাত মোল্লা আনোয়ার, হারুন, ‘ফইটকা দেলা’ এখনো ইয়াবা বিক্রি করছেন। তারা সবাই ইয়াবার ডিলার। দেলা, মোল্লা পিন্টু, আমীর, ঘুরে-ঘুরে ইয়াবা বিক্রি করেন।

গেণ্ডারিয়া থানাধীন করাতিটোলায় ইয়াবা বিক্রি করছেন লাদেন জামাল, পিন্টু। দয়াগঞ্জে বাজারে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে ইয়াবা বিক্রি করছেন ব্ল্যাক রবিন। গেণ্ডারিয়া থানা থেকে কয়েক গজ দূরে মাইকপুল এলাকায় ইয়াবাসহ গাঁজা বিক্রি করেন ডানো, মামুন, রাজিব, ডিলার ও মনির। তারা সবাই চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে মামলাও রয়েছে।

ঘুণ্টিঘরের পাশের এই রেললাইনের ধারে চলে ইয়াবা বিক্রি। ছবি: প্রিয়.কম

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গেণ্ডারিয়ার মুন্সিরটেক এলাকার পরিত্যক্ত একটি টিনশেডের দ্বিতীয় তলায় ইয়াবা বিক্রি করেন বেলি, ঘুণ্টিঘর এলাকার রুবেল, পলাশ ও কানা মিন্টু।

পুলিশের ভাষ্য

পুলিশের উপস্থিতির মধ্যেই মাদকের ব্যবসার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ওয়ারী জোনের ডিসি মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দীন প্রিয়.কমকে বলেন, ‘নামাপাড়া রেলবস্তি ছাড়া আর কোথাও অভিযান চলেনি। রহিমার দুই-একজন সহযোগী আছেন। তাদের কেউ কেউ আটক হয়েছে।’

রহিমা এলাকায় আসেন না জানিয়ে মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দীন আরও বলেন, ‘রহিমা দূর থেকেই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। আপনার কাছে মাদক বিক্রির যে তথ্য আছে, তা পুরোপুরি সত্য নয়। আসলে এসব হলো মানুষের পারসেপশন (অনুমান)। আর মানুষের ধারণাগুলো পরিবর্তন হতে সময় লাগবে। তবে মাদক বিক্রির এমন তথ্য থাকলে আমাদের তা ভেরিফাই (যাচাই) করতে হবে।’

এই সম্পর্কীও খবর

Recent Posts