মুক্ত জীবন-রুদ্ধ প্রাণ এই মে, সেই মে

মুক্ত জীবন-রুদ্ধ প্রাণ এই মে, সেই মে

মে ৩১, ২০১৮ 0 By admin
Spread the love

মাহফুজ উল্লাহইংরেজি পঞ্জিকার মে মাসটি ক্রমেই বাংলাদেশের জনগণের কাছে স্মরণীয় হয়ে উঠছে। এমনিতে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও মে দিবস উৎসাহ-উদ্দীপনায় পালিত হয়, টেলিভিশন চ্যানেলে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়, খবরেও উঠে আসে দিনটি পালনের সংবাদ। অবশ্য বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে মে দিবসের যে সংগ্রামী চেহারা ছিল, বর্তমানে তা আর নেই।

তবে বর্তমান বছরে মে আরও অনেক কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখন সর্বত্র মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে চলছে আলোচনা। আলোচনার মূল বিষয় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ক্ষুদে মাদক ব্যবসায়ীদের প্রাণনাশ। সরকারিভাবে বলা হচ্ছে, এরা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হচ্ছে।

যারা নিহত হচ্ছে তারা অতিকায় ব্যবসায়ী না হলেও তাদের কাছে আছে অস্ত্র, যাকে মেনে নিলে আঁতকে উঠতে হবে। মাদকবিরোধী অভিযানে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহতদের সংখ্যা এরই মধ্যে ১০০ ছাড়িয়ে গেছে।

এ অভিযানকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় জনসাংবাদিকতার যে মন্তব্য ও ব্যাখ্যা প্রচারিত হচ্ছে তা বিস্ময়কর। বিভিন্নভাবে বিভিন্নজন এই অভিযানকে ব্যাখ্যা করছেন; কিন্তু ব্যাপক কোনো সমর্থন লক্ষ করা যায়নি।

মানুষজন প্রশ্ন তুলছে, যারা মাদকের গডফাদার হিসেবে পরিচিত, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে না কেন? মামলা থাকার অপরাধে বিনা বিচারে শাস্তি পাচ্ছে ক্ষমতাহীনরা।

তাই যদি হয়, যে ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে মামলা আছে, তাদের মারা হচ্ছে না কেন? এখানেও ক্ষমতার লড়াই, শ্রেণীবিভেদ; গরিব, ক্ষমতাহীন হলেই মরতে হবে। অনেকেই বিনা বিচারে ক্ষুদে মাদক ব্যবসায়ীদের মেরে ফেলার পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, কলম্বিয়ার উদাহরণ সামনে নিয়ে আসেন। হাজার হাজার মানুষ হত্যা করার পরও এসব দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি।

মাদকাসক্তি অপরাধ নয়, মূলত অসুস্থতা। অন্য অনেক অসুস্থতার মতো এটিও একধরনের অসুস্থতা। এখানে প্রয়োজন চিকিৎসা, গুলি নয়। তবু অনেকে বলেন, অভিযান আরও তীব্র হলে মৃতের সংখ্যা ৭০০ ছড়িয়ে যেতে পারত।

গুলি করে যে এ ধরনের সমস্যার সমাধান করা যায় না, আমাদের অভিজ্ঞতা তা-ই বলে। ১৯৭১ সালে নকশালবাড়ি আন্দোলনের শত শত কর্মীকে হত্যা করে ভারত সরকার ভেবেছিল সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। কিন্তু সাম্প্র্রতিক বছরগুলোয় সেই নকশালবাড়ি আন্দোলনের অনুসারীরা মাওপন্থী হিসেবে ভারতের ২৬টি রাজ্যে যে রাজনীতি জারি রেখেছে, তা সামলাতে ভারত সরকারকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে।

আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে অস্থায়ী জয়ের আনন্দ পেলেও সেখানে আফিম উৎপাদনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। এ আফিম ব্যবসার অর্থ যায় তালেবানদের পকেটে অস্ত্র সংগ্রহের জন্য। মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পানামা ও কলম্বিয়ায় অভিযান চালিয়েছে। এই অভিযানে হয়তো ব্যক্তির অপসারণ ঘটেছে, কিন্তু মাদক ব্যাপক হারে প্রবেশ করেছে মার্কিন সমাজে।

বাংলাদেশেও শেখ মুজিবের শাসনামল থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে চোরাকারবারি, কালোবাজারি, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, সন্ত্রাসী দমনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক নিষ্ঠুর অভিযান পরিচালিত হয়েছে; কিন্তু কাক্সিক্ষত স্থায়ী সমাধান আসেনি।

সরকারি বক্তৃতা-বিবৃতিতে মনে হচ্ছে, মাদকবিরোধী নিষ্ঠুর অভিযান অব্যাহত থাকবে। কিন্তু রাষ্ট্র যখন আইনের শাসনের কথা বলে, তখন এ ধরনের ‘বন্দুকযুদ্ধে’ হত্যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য ও সমর্থনযোগ্য নয়। বর্তমান সরকার গর্ব করে বলে, অনেক অপরাধের বিচার করে তারা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু এই প্রথম এতজন মানুষের এই মৃত্যু আইনের শাসনকে চ্যালেঞ্জ করছে।

বোঝা যাচ্ছে, যারা আইনকে রক্ষা করবেন তারাই আইনের শাসনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এ কারণেই দিনের পর দিন বন্দুকযুদ্ধের একই কাহিনী শুনতে হচ্ছে। এ নির্মম অভিযানের ফলে নিরীহ জনপ্রতিনিধিও যে হত্যার শিকার হচ্ছেন টেকনাফের একরামুল হকের ঘটনা তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

অবশ্য অভিযানের চেহারা একেক জায়গায় একেক রকম। কোথাও রাতের অন্ধকারে অভিযান চলে, কোথাও ঢাকঢোল পিটিয়ে, সামিয়ানা টাঙিয়ে পরিচালিত হচ্ছে অভিযান।

যত দিন যাচ্ছে ততই এই অভিযান সম্পর্কে নানারকম তথ্য আসছে। প্রকাশিত হচ্ছে মাদক, বিশেষ করে ইয়াবা পাচারের বিভিন্ন চমক লাগানো পদ্ধতির খবর। একই সঙ্গে বলা হচ্ছে, বিষয়টি আগে থেকে সবাই জানতেন।

তাই যদি হয়ে থাকে, তাহলে এতদিন এর প্রসার ঠেকানো হল না কেন? প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে কেউ কেউ ভিন্ন কথা বলছেন। বলা হচ্ছে, নির্বাচনের বছরে এ ধরনের কার্যক্রমের মাধ্যমে সরকার একটি পরিচ্ছন্ন চেহারার কথা জানান দিতে চায়। শোনা যাচ্ছে, এরপর আরও অভিযান আসবে, অন্য সমস্যার এমন নিষ্ঠুর সমাধানে।

মাদকবিরোধী নিষ্ঠুর অভিযানের জন্য মে যেমন স্মরণীয় হয়ে থাকবে, তেমনি আরও একটি কারণে মানুষ এ মাসের কথা মনে রাখবে। স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে জনআস্থা হারাতে পারে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত খুলনা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন তা প্রমাণ করেছে।

নির্বাচন কমিশনের কাছে ক্ষমতাসীন দলের বিজয়টাই মুখ্য ছিল, প্রতিষ্ঠানকে মর্যাদা দেয়া ও নির্বাচনী সৌন্দর্যের বিজয় বিবেচনায় ছিল না। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্তি বোধহয় মানুষকে মোহগ্রন্ত করে, যে কারণে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত অধিকাংশ নির্বাচন কমিশনই নিজের মান-মর্যাদা অক্ষুণœ রাখতে পারেনি। এ দোষ থেকে অনেক দেশই মুক্ত নয়। যেমনটা ঘটেছে মালয়েশিয়ার সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনের সময়। সেখানে অবশ্য বোমা-বন্দুক ছিল না বলে বিরোধীরা জয়লাভ করেছে।

নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা যে বিষয়টি ভুলে যান তা হচ্ছে, এ দায়িত্ব পালনে তাদের কোনো প্রভু বা নির্দেশদাতা নেই। আত্মমর্যাদার সঙ্গে এ বিষয়টি মিলিয়ে দেখলে তারা দায়িত্ব পালনে সাহসী হতে পারবেন। অবশ্য তাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই।

তারা দেখেছেন, অতীতে দুষ্কর্ম করে দায়িত্ব শেষে অনেকেই গণমাধ্যমে জনগণকে নীতি কথা শোনান। দায়িত্বে থেকে প্রভুর মনোরঞ্জন আর দায়িত্ব শেষে প্রভুদের ছিদ্রান্বেষণ করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

বাংলাদেশের বয়স যত বাড়ছে তত মনে হচ্ছে বয়সের অভিজ্ঞতা তার কাজে লাগছে না। মানুষ বয়সে বড় হলে, চুলে পাক ধরলে তার জ্ঞান-বুদ্ধির ঝাঁপি ভারি হয় বলে মনে করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ মনে হচ্ছে সে পথে না হেঁটে শিশুর মতো ভুল করে করে এগিয়ে যাচ্ছে এবং পরিণত বয়সে হয়ে উঠছে অবাধ্য ব্যক্তি। তাই কখনও কখনও মনে হয়, এসব নিয়ে আলোচনা অর্থহীন, সমালোচনায় দোষ সারবে না। আবার যখন মাও সেতুংয়ের লেখা ‘যে বোকা বুড়ো পাহাড় সারিয়েছিল’ পুনর্বার পাঠ করি, তখন আশার আলো উঁকি দেয়।

এই উঁকির ফাঁকেই মনে পড়ে অর্ধ শতাব্দী আগে, ১৯৬৮ সালের মে মাসে ফ্রান্সের প্রতিবাদের কাহিনী। এই প্রতিবাদ অবশ্য কয়েক মাসের মাথায় পাকিস্তানকেও আন্দোলিত করেছিল, পতন ঘটেছিল স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের। আন্দোলনের মুখে এ সময়েই ফ্রান্সের শাসক জেনারেল দ্য গল কিছুদিনের জন্য পালিয়ে জার্মানি চলে গিয়েছিলেন।

ফ্রান্সে প্রতিবাদ মানেই নাট্যমঞ্চের নাটক। বর্তমান বছরে মে মাসের ঘটনাবলিতে মনে হচ্ছে ফ্রান্স নতুন করে নাট্যমঞ্চে প্রবেশ করছে। এ মাসের প্রথম সপ্তাহে ফ্রান্সে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সর্বত্র যেভাবে সরকারবিরোধী আন্দোলন, বিশৃঙ্খলা হয়েছে, গাড়িঘোড়া আগুনে পুড়েছে, তা ফরাসিদের অনেকেই কল্পনা করতে পারেনি। পারেননি বয়সে তরুণ ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোও।

অবশ্য ১৯৬৮ সালের মে মাসে ফ্রান্সে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল সেদেশের দুটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়- নানতেয়ার ও সোবর্নে। ধীরে ধীরে এক কোটি শ্রমিকের অংশগ্রহণে অচল হয়ে গিয়েছিল ফ্রান্স।

কিন্তু আজ সেখানেও হতাশা গ্রাস করেছে, ফরাসিরা আন্দোলন ধরে রাখতে পারছে না। এই উদাহরণ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না-ও হতে পারে। কিন্তু ৫০ বছর আগে এ দেশেও তা-ই ঘটেছিল। বিষয়টি হচ্ছে, কোনো দেশের মানুষই এখন আর একদলীয় শাসন ও মতাদর্শে অন্ধ হয়ে যায় না।

এসব কারণেই মে মাসের ঘটনাবলি এ দেশের মানুষের অনেক দিন মনে থাকবে। যেমনভাবে মনে থাকবে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক ভারত সফরের বিষয়টি। প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে সম্মানিত হয়েছেন, সে সম্মান জনগণকে উৎসর্গ করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য ভারত এখনও ভালোবাসা দেখাতে পারেনি- অন্ততঃপক্ষে নদীর জলের প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে। ভারতের সচেতন মানুষের উচিত এখন পরিষ্কার করে বলা- বাংলাদেশের দেয়ার বিনিময়ে ভারত বাংলাদেশকে কী দিয়েছে।

মাহফুজ উল্লাহ : সাংবাদিক ও শিক্ষক

এই সম্পর্কীও খবর

Recent Posts