মা-বাবার খোঁজে ডেনমার্ক থেকে পাবনায়

ডেনমার্কের নাগরিক মিন্টো কারস্টেন সনিক ও তার স্ত্রী এনিটি হোলমি হেবকে। ছবি: সংগৃহীত

(ইউএনবি) ছয় বছর বয়সে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন মিন্টো। হারিয়ে গিয়েছিলেন পাবনার নগরবাড়ি ঘাট এলাকা থেকে। ৪১ বছর পর শুধু এটুকু স্মৃতিই মনে পড়ে। তার সঙ্গে আছে শৈশবের কয়েকটি ছবি আর পাসপোর্ট। বলতে পারেন না বাংলা।

সেই ছবি হাতে নিয়ে পাবনায় ফিরে হারানো স্বজনদের খোঁজে পথে নেমেছেন বর্তমানে ডেনমার্কের নাগরিক মিন্টো কারস্টেন সনিক। তার সঙ্গে নিয়ে এসেছেন স্ত্রী এনিটি হোলমি হেবকে। প্রিয়জনদের খুঁজে পাওয়ার আশায় ১২ সেপ্টেম্বর, বুধবার পাবনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছেন তারা।

মিন্টো পেশায় চিত্রশিল্পী। আর তার স্ত্রী চিকিৎসক। স্ত্রীকে সাথে নিয়ে দিন দশেক আগে তিনি পাবনায় আসেন। কয়েক দিন ধরে তারা পাবনা শহর আর নগরবাড়ি এলাকায় ঘুরছেন, যাচ্ছেন এ গ্রাম থেকে সে গ্রামে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানতে চাইছেন, কেউ সেই হারিয়ে যাওয়া ছেলেটির বিষয়ে কোনো তথ্য জানে কি না।

মিন্টোর শৈশবের ছবিসহ বাংলায় লেখা একটি লিফলেট বিলি করছেন দুজন। সেখানে লেখা, ‘১৯৭৭ সালের দিকে প্রায় ৪০ বছর আগে আপনি কি আপনার পরিবারের কোনো সদস্যকে হারিয়েছেন?’

সংবাদ সম্মেলনে মিন্টো জানান, শৈশবের আসল নাম তার মনে নেই। একটি শিশু সদন থেকে তাকে দত্তক নিয়েছিলেন ডেনমার্কের এক নিঃসন্তান দম্পতি। তাদের স্নেহে ডেনমার্কেই বড় হয়েছেন, বিয়ে করে সংসারী হয়েছেন। একটি ছেলে ও একটি মেয়ে রয়েছে তাদের।

ডেনমার্কের এই নাগরিক জানান, শিশু সদন থেকেই তিনি জানতে পেরেছেন যে, তার নাম মিন্টো। নগরবাড়ি ঘাটে অভিভাবকহীন অবস্থায় তাকে খুঁজে পেয়েছিলেন ঢাকার ঠাঁটারীবাজার এলাকার চৌধুরী কামরুল হুসাইন নামের এক ব্যক্তি। তিনিই ১৯৭৭ সালের ৪ এপ্রিল মিন্টোকে শিশু সদনে রেখে যান। পরে পালক বাবা-মায়ের সাথে তিনি চলে যান ডেনমার্ক।

মিন্টোর ভাষ্য, ‘ছোটবেলায় বিষয়গুলো তেমনভাবে উপলব্ধি করতে না পারলেও বয়স বাড়ার সাথে সাথে আত্মপরিচয়ের সংকট দানা বাঁধতে থাকে মনের ভেতরে। ডেনমার্কে অনেকে আমার শেকড়ের খবর জানতে চেয়েছেন। সেই মানসিক কষ্ট আর যন্ত্রনা আমাকে কুড়ে কুড়ে খেতে থাকে। ডেনমার্কের জীবনে কোনো কিছুর অভাব হয়নি কখনো, কিন্তু একটি শূন্যতা সবসময় বুকের গভীরে ক্ষত তৈরি করে বাসা বাঁধে।’

‘আমি ডাঙায় তোলা মাছের মতো ছটফট করতে শুরু করলাম। কিছুই ভালো লাগত না। পরিবারের লোকজনের সাথে দুর্ব্যবহারও করেছি অকারণে। তেমন কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র হাতে ছিল না। তারপরও প্রাণের টানে নিজের বাবা-মা, স্বজনদের খোঁজে আমার পাবনায় আসা।’

গত ১০ দিনের সন্ধানে আশা জাগার মতো কোনো তথ্য মিন্টো পাননি। সকালবেলা স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে পথে নামেন তিনি। বাংলা বলতেও পারেন না, বুঝতেও পারেন না। কিন্তু বুকে হাত রেখে বাবা-মায়ের কথা বোঝাতে চান এবং তাদের সন্ধান চান।

মিন্টো বলেন, ‘আমি বাংলাদেশে আসার পর চোখ বন্ধ করে শ্বাস নিলেই মনে হয়, আমার সেই স্বজনদের গন্ধ পাচ্ছি। ছোটবেলায় বাংলায় কথা বলতে পারতাম, পরে ভুলে গেছি। কিন্তু এখন বাংলা কথা কানে এলেও অন্যরকম এক অনুভূতি হয় আমার, আমি বলে বোঝাতে পারব না।’

শেকড়ের সন্ধান করার এই চেষ্টায় মিন্টোকে সহযোগিতা করছেন পাবনার বাসিন্দা স্বাধীন বিশ্বাস। ফেসবুকে পরিচয় থেকে তাদের মধ্যে গড়ে উঠেছে বন্ধুত্ব।

স্বাধীন বিশ্বাস বলেন, ‘ফেসবুকে কথা হলে ওকে দেশে আসতে বলেছিলাম আমি। ও চলে এসেছে। আমরা চেষ্টা করছি ওর স্বজনদের খুঁজে বের করার।’

স্বজনদের সন্ধানে ইতোমধ্যে পাবনা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন মিন্টো। সদর থানায় একটি এজাহার দায়ের করেছেন তিনি।

এ বিষয়ে পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) শামীমা আক্তার বলেন, ‘পুলিশের পক্ষ থেকে যতটুকু সহযোগিতা করা সম্ভব, তা করা হচ্ছে।’

পুলিশের পাশাপাশি গণমাধ্যমকেও সহযোগিতা করার আহ্বান জানান শামীমা।

, ,
শর্টলিংকঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *