গার্মেন্টস খোলার বিরোধিতা করছে সরকারের শরিকরা বামদল ও শ্রমিক সংগঠনগুলো

admin

ডেস্ক নিউজঃ   দেশের বামদল ও শ্রমিক সংগঠনগুলো এই মুহূর্তে পোশাক কারখানা খোলার তীব্র বিরোধিতা করছে। বামদলের নেতারা বলছেন, দেশে যখন সাধারণ ছুটি ও লকডাউন চলছে এবং দেশবাসী চরম আতঙ্কে তখন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ছাড়াই একেবারে অপ্রস্তুত অবস্থায় এভাবে গার্মেন্টস খুলে দেয়াটা গোটা জাতির জন্যই আত্মঘাতী। শুধু তাই না গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিয়ে মালিক ও সরকারের যে মরণখেলা শুরু হয়েছে তা আরও ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। এমনকি সরকারের শরিক ১৪ দলের নেতারা সরকারের এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছে।

শ্রমিক সংগঠনের নেতারা আরও বলছেন, মালিক ও সরকারের স্বেচ্ছাচারী ভূমিকার কারণে শ্রমিকদের জীবন বিপন্ন হলে তার সম্পূর্ণ দায়-দায়িত্ব সরকার ও মালিকদেরকেই বহন করতে হবে।

দেশে করোনাভাইরাসের বিস্তার এবং আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বেড়ে যাওয়ার কারণে গত ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। গার্মেন্টস কারখানাসহ সমস্ত কলকারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস-আদালত বন্ধ হয়ে যায়। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তার আগেই বন্ধ করে দেয়া হয়। এরই মধ্যে পোশাক শ্রমিকদের একদফা ডেকে এনে ফিরিয়ে দিয়েছে মালিকরা। শ্রমিকরা পায়ে হেঁটে শত শত মাইল পাড়ি দিয়ে ঢাকায় এসেছে। এর সমালোচনা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও করেছেন। এরপর আবারও এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শুধু ঢাকার শ্রমিকদের কথা বললেও সারাদেশ থেকেই শ্রমিক ঢাকায় এসেছে। অনেকে পায়ে হেঁটে, নৌকায় চড়ে, ট্রাকে করে এনমকি কাভার্ডভ্যানেও এসেছে। করোনাভাইরাসের এই মহাবিপর্যয়ের মধ্যে গার্মেন্টস কারখানা খুলে দেয়ার ঘটনায় সরকার এবং বামসংগঠন ও শরিকদের মধ্যে বিতর্কও চলছে।

গার্মেন্টস কারখানা খুলে দেয়া প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, করোনা সংকটে তৈরি পোশাকশিল্পের আন্তর্জাতিক বাজার হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় ঢাকার আশপাশের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি সীমিত আকারে চালু করা হয়েছে। এসকল ফ্যাক্টরিতে ঢাকায় অবস্থানকারী শ্রমিকদের কাজে লাগানোর কথা বলা হয়েছে।

তিনি বলেন, মালিকরাও তা মেনে নিয়েছে কিন্তু চাকরি হারানোর ভয়ে অসংখ্য শ্রমিক ঢাকায় প্রবেশ করছে, এ বিষয়ে মালিকদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে।

গার্মেন্টস কারখানা খুলে দেয়া প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, বাইরে থেকে কোনো শ্রমিক নয়; শুধু ঢাকায় অবস্থানরত শ্রমিকদের দিয়ে কারাখানা চালু করতে হচ্ছে। বাইরে থেকে কোনো শ্রমিক আসতে পারবেন না। আমরা কোনো শ্রমিক দূর-দূরান্ত থেকে আনছি না। তারপরও অনেকে চলে আসছেন। আমরা তাদের নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করছি। যারা ইতোমধ্যে চলে এসেছে আমরা চাচ্ছি ঈদে তারা আবার গ্রামে ফিরে না যাক।

তিনি বলেন, তারা (পোশাক কারখানার মালিকরা) প্রধানমন্ত্রীর কাছে ওয়াদা করেছেন যে জনস্বার্থে এবং স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে কারখানা চালু করবেন এবং করোনাভাইরাসে যেন আরও অনেকে আক্রান্ত না হন।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম গার্মেন্টস খোলা প্রসঙ্গে বলেন, বর্তমান করোনা-মহাবিপর্যয়কালে গার্মেন্টস খুলে দেয়াটা গোটা জাতির জন্যই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। বর্তমান পরিস্থিতিতে গার্মেন্টস, কারখানা খুলে দেয়া চরম হঠকারিতা। এটা মালিকের মুনাফার স্বার্থে শ্রমিকদের মৃত্যুকূপে ঠেলে দেয়া ছাড়া কিছুই নয়। করোনা-মহাবিপর্যয়কালে এর আগেও মালিকরা গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে।

তিনি বলেন, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে, মালিক ও আমলাদের সুবিধামতো নয়। জরুরি প্রয়োজনে চালু রাখা গার্মেন্টসে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, ঘোষিত স্বাস্থ্যবিধি পরিপূর্ণভাবে মানতে হবে। শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসম্মত থাকা ও খাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে সকল শ্রমিক ও কর্মচারীকে কারখানার অভ্যন্তরে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে।

সরকারের শরিকদল বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, যেভাবে হঠাৎ করে তাদের ডেকে এনে কারখানার কাজে যোগদান করানো হয়েছে, এটা ঠিক হয়নি। আর গার্মেন্টস শ্রমিকদের যেভাবে শত শত মাইল হেঁটে আনার যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে সেটাও অমানবিক। গার্মেন্টস যদি খুলতেই হয় তাহলে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, প্রত্যেক শ্রমিককে কারখানা থেকে মাস্ক, গ্লাভস, হেডকাভারসহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য-সুরক্ষা সামগ্রী প্রদান করতে হবে। এ সময়ে কোনো শ্রমিকের বেতন-ভাতা বকেয়া রাখা যাবে না, কোনো কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই এবং লে-অফ করা যাবে না।

সরকারের আরেক শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, একদিকে সরকারি ছুটির নামে অঘোষিত লকডাউন করে মানুষকে ঘরে রেখে সংক্রমণ বিস্তার রোধ এবং লকডাউনে কর্মহীন নিরুপায় অসহায় মানুষকে ত্রাণ সহায়তা প্রদান করে মানুষ বাঁচানোর আপ্রাণ ও অকান্ত প্রচেষ্টা চলছে। অন্যদিকে সীমিত আকারে গার্মেন্টস খুলে দেয়া, শিথিলতা, সমন্বয় ও পরিকল্পনাহীনতা যেন করোনা সাগর পারি দিতে মাঝ সাগরে হাল ছেড়ে দেয়া বা যুদ্ধে নেমে মাঝপথে রণভঙ্গে আত্মসমর্পণে পরিণত না হয়।

তিনি বলেন, পোশাকশিল্প কারখানার মালিকরা সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে তাদের ইচ্ছামতো সারাদেশ থেকে শ্রমিক এনে কারখানা চালাচ্ছে।

বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, করোনা মহামারিতে দেশে শ্রমজীবী-মেহনতি মানুষ সবচেয়ে অরক্ষিত, অসহায় ও বিপন্ন। এই মহাদুর্যোগে কোটি কোটি শ্রমজীবী-মেহনতি মানুষের সংক্রমণ প্রতিরোধে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত সুরক্ষা যেমন নেই, তেমনি খাদ্যনিরাপত্তাসহ তাদের কার্যকরী কোনো সামাজিক নিরাপত্তাও নেই। সংক্রমণরোধে উপযুক্ত ব্যবস্থা ও কর্মপরিবেশ সৃষ্টি না করে যেভাবে গার্মেন্টস কারখানা চালু করা হয়েছে তা করোনার ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে শ্রমিকদের আশঙ্কাজনকভাবে করোনা ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। এই অবস্থায় গোটা দেশেই সংক্রমণ আরও বেড়ে যাওয়ার গুরুতর আশঙ্কা তৈরি করেছে।

বাম ঐক্যফ্রন্টের সমন্বয়ক নাসির উদ্দীন আহম্মদ নাসু, বাসদ (মাহবুব) আহ্বায়ক সন্তোষ গুপ্ত বলেন, গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিয়ে মালিক, সরকারের মরণখেলা চলছেই। প্রথমে মালিকরা ছাঁটাই ও বেতন দেয়ার কথা বলে বিপদগ্রস্ত শ্রমিকদের একবার নিয়ে আসে খালি হাতে ফিরিয়ে দিয়েছিল। আবার সেই অপকৌশলের ফাঁদে ফেলে কারখানা খুলে দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, সাধারণ ছুটি, লকডাউন চলছে, সকলকে নির্দিষ্ট দূরত্বে থাকার কথা বলা হচ্ছে। অন্যদিকে কারখানা খুলে দেয়া হয়েছে, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেয়া হয়নি, চলছে লে-অফ, ছাঁটাই। সরকার-মালিকদের এই ধরনের নিষ্ঠুরতা ও দ্বিচারিতা অত্যন্ত অমানবিক।

শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) নেতৃবৃন্দ এর আগে গার্মেন্ট খোলার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বিবৃতি দেন। তারা বলেন, এই পরিস্থিতিতে গার্মেন্টস খোলা রাখাটা শ্রকিরদের মৃত্যু ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেয়া।

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির (মার্কসবাদী) সভাপতি নূরুল হাসান বলেন, গাড়ি বন্ধ থাকা অবস্থায় স্বাস্থ্যনিরাপত্তা উপেক্ষা করে গার্মেন্টস খুলে দেয়া ও হাজার হাজার শ্রমিক পায়ে হেঁটে কাজে যোগদানের দৃশ্য করোনা বিস্তারের পথকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। এটি সরকারের বিভ্রান্তিকর ও দ্বৈতনীতির বহিঃপ্রকাশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Next Post

হাসপাতালে চিকিৎসক নেই, ১০ দিনে ১০ শিশুর মৃত্যু

মাতুয়াইলের শিশু-মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পাওয়া যাচ্ছে না চিকিৎসক; অবহেলায় রোগী মৃত্যুর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এটি একটি সরকারি হাসপাতাল। নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না চিকিৎসক। ফলাফল, বিনা চিকিৎসায় একদিনে ৩ শিশুর মৃত্যু। শুধু তাই নয়, গত ১০ দিনে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে ১০ শিশু। এমন ঘটনা ঘটেছে মাতুয়াইলের শিশু-মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে। স্বজনদের […]

Subscribe US Now