১৪ দলের শরিক ও জাপার আসন বণ্টন ৪৮ এমপিই প্রার্থী, নতুন ২২

 অনির্বাণ নিউজ ডেস্ক ● জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের শরিক রাজনৈতিক দলগুলোর বর্তমান এমপিদের আসনগুলো ছেড়ে দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে এখনো জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের শরিকদের মধ্যে আসন বণ্টন বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বৈঠক না হলেও সরকারি মহলে এ বিষয়ে কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে। আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের সূত্র কালের কণ্ঠকে এই তথ্য জানিয়ে বলেছে, এর বাইরে আরো সর্বোচ্চ ২১ আসন শরিকদের ছেড়ে দেওয়া হতে পারে। বর্তমান দশম জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের শরিক দলগুলোর সরাসরি নির্বাচিত ৪৯ সদস্য রয়েছেন। এর বাইরেও সংরক্ষিত আসনে তাদের এমপি রয়েছেন আরো আটজন। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তাদের সর্বোচ্চ ৭০টি আসন ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারে প্রাথমিক আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে সংসদে জাতীয় পার্টি থেকে সরাসরি নির্বাচিত সদস্য রয়েছেন ৩৪ জন। এর মধ্যে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ময়মনসিংহ-১ আসনের এমপি এম এ হান্নানের বিচার চলছে। ওই আসনে আর এম এ হান্নানকে চায় না আওয়ামী লীগ। ১৪ দলের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির ছয়, জাসদ পাঁচ, তরীকত ফেডারেশন দুই ও জেপি থেকে সরাসরি নির্বাচিত দুই সদস্য বর্তমান সংসদে রয়েছেন। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের শরিক রাজনৈতিক দলগুলোর সরাসরি নির্বাচিত ৪৮ জন বর্তমান এমপির ব্যাপারে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে।

দলগুলো নিজেদের মতো করে নির্বাচন প্রস্তুতির কাজও গুছিয়ে এনেছে। অনানুষ্ঠানিকভাবে ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের কেউ কেউ প্রধান শরিক আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। ১৪ দলের কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রায় এক ডজন নেতা কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, আগামী নির্বাচনে ১৪ দলের শরিকদের ২০-২২টি আসন ছেড়ে দেওয়া হতে পারে। জাতীয় পার্টিকে সর্বোচ্চ ৪৫-৫০টি আসন দেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত রয়েছে। বিএনপি নির্বাচনে না এলে ১৪ দলের শরিকরা আরো বেশ কটি আসন পাবে।

সূত্রগুলো জানায়, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদান শেষে দেশে ফিরে আগামী মাসের প্রথম দিক থেকেই আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৪ দলের শরিক সব রাজনৈতিক দলের নেতার সঙ্গে কথা বলার সম্ভাবনা রয়েছে। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের সঙ্গে জাতীয় সংসদ ভবনে বৈঠক করেছেন। সেখানে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিষয়ে আলোচনা হয়। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী ১৪ দলের শরিক জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, জেপি ও তরীকত ফেডারেশনের নেতাদের দু-এক দিনের মধ্যে অনুরূপ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের শরিকদের সঙ্গে নির্বাচনে আসন বণ্টনের বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত মঙ্গলবার বলেন, বিএনপি যদি নির্বাচনে না আসে তাহলে জাতীয় পার্টি আলাদা নির্বাচন করবে। আর বিএনপি যদি নির্বাচনে আসে তাহলে জাতীয় পার্টির সঙ্গে আসন বণ্টন, সমঝোতা এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। সব কিছু নির্ভর করছে মেরুকরণ কিভাবে হবে, সেভাবেই অ্যালায়েন্সের সমীকরণ হবে। জোটগতভাবে নির্বাচন করলে শরিকদের জন্য ৬৫-৭০টি আসন ছেড়ে দেওয়া হবে।

জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের কালের কণ্ঠকে বলেন, কোনো জোটের সঙ্গে নির্বাচন করার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে মহাজোটে থাকলে একশ’টি আসন চাওয়া হবে—এমন ঘোষণা রয়েছে পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের।

জাতীয় পার্টি : বিএনপি নির্বাচনে এলে জাতীয় পার্টির সঙ্গে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করবে ১৪ দল। সে ক্ষেত্রে জাতীয় পার্টি যে ৩৪টি আসন থেকে নির্বাচিত হয় তার সব কয়টি পাবে। আওয়ামী লীগের ছেড়ে দেওয়া আসন গাইবান্ধা-১-এর উপনির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী নির্বাচিত হন। ওই আসনটিও জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেওয়া হবে। এর বাইরে আরো ১০-১৫টি আসন জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দিতে পারে আওয়ামী লীগ।

জাতীয় পার্টির যারা আগামী নির্বাচনে জোটের মনোনয়ন পেতে পারেন : নীলফামারী-৪ শওকত চৌধুরী, লালমনিরহাট-৩ জি এম কাদের, রংপুর-১ মশিউর রহমান রাঙ্গা, রংপুর-৩ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, কুড়িগ্রাম-১ এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমান, কুড়িগ্রাম-৩ ডা. আক্কাস আলী, গাইবান্ধা-১ শামীম হায়দার পাটোয়ারী, বগুড়া-২ শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ, বগুড়া-৩ নুরুল ইসলাম তালুকদার, বগুড়া-৬ নুরুল ইসলাম ওমর, বগুড়া-৭ আলতাফ আলী, পটুয়াখালী-১ এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার, বরিশাল-৬ নাসরিন জাহান রত্না, জামালপুর-৪ মামুনুর রশীদ, ময়মনসিংহ-৪ রওশন এরশাদ, ময়মনসিংহ-৫ সালাউদ্দিন আহমেদ, ময়মনসিংহ-৮ ফখরুল ইমাম, কিশোরগঞ্জ-৩ মুজিবুল হক, ঢাকা-১ সালমা ইসলাম, ঢাকা-৪ সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, ঢাকা-৬ কাজী ফিরোজ রশীদ, নারায়ণগঞ্জ-৩ লিয়াকত হোসেন খোকা, নারায়ণগঞ্জ-৫ সেলিম ওসমান, সুনামগঞ্জ-৪ পীর ফজলুর রহমান, সিলেট-২ ইয়াহইয়া চৌধুরী, সিলেট-৫ সেলিম উদ্দিন, হবিগঞ্জ-১ আবদুল মুনিম চৌধুরী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ জিয়াউল হক মৃধা, কুমিল্লা-২ আমির হোসেন, কুমিল্লা-৮ নুরুল ইসলাম মিলন, লক্ষ্মীপুর-২ মোহাম্মদ নোমান, চট্টগ্রাম-৫ আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, চট্টগ্রাম-৯ জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু এবং কক্সবাজার-১ মোহাম্মদ ইলিয়াস। এ ছাড়া লালমনিরহাট-৩ আসনে জি এম কাদের মনোনয়ন পাবেন। কুড়িগ্রাম-২ আসনটিও জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ওয়ার্কার্স পার্টি : ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন ঢাকা-৮, ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশাহ রাজশাহী-২, ঠাকুরগাঁও জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সংসদ সদস্য ইয়াছিন আলী ঠাকুরগাঁও-৩, নড়াইল জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সংসদ সদস্য শেখ হাফিজুর রহমান নড়াইল-২, ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় পলিটব্যুরোর সদস্য ও সংসদ সদস্য সাতক্ষীরা-১, বরিশাল জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য টিপু সুলতান বরিশাল-৩, ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য নুর আহমেদ বকুল মেহেরপুর-২ আসনে মনোনয়ন পাওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে সাতটি আসন চাইবে ওয়ার্কার্স পার্টি।

জানতে চাইলে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা বেশ কয়েকটি আসনে মনোনয়ন চাইব। আর বর্তমান সংসদে আমাদের ছয়জন প্রতিনিধি রয়েছেন, তাঁদের মনোনয়নের জন্য বিশেষ গুরুত্ব দেব।’

জাসদ : জাসদের সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু কুষ্টিয়া-২, জাসদের সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য শিরীন আখতার ফেনী-১, জাসদ স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য রেজাউল করিম তানসেন বগুড়া-৪, জাসদ স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য শাহ জিকরুল আহমেদ ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫, ময়মনসিংহ পৌরসভার প্যানেল মেয়র ও ময়মনসিংহ মহানগর জাসদ সভাপতি সৈয়দ শফিকুল ইসলাম মিন্টু ময়মনসিংহ-৬ আসনে মনোনয়ন পেতে পারেন। এ ছাড়া জাসদের পক্ষ থেকে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য জায়েদুল কবির নরসিংদী-২, জাসদ স্থায়ী কমিটির সদস্য রবিউল আলমের জন্য যশোর সদর আসনে জোরালোভাবে মনোনয়ন চাওয়া হবে। জাসদের সূত্রগুলো জানায়, দলটির পক্ষ থেকে ২৫ জনের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এ তালিকার ভিত্তিতে ১৪ দলের সঙ্গে জাসদ আসন সমঝোতার আলোচনা চালাবে। বর্তমানে সংসদে সরাসরি নির্বাচিত জাসদের প্রতিনিধি রয়েছেন তিনজন।

বাংলাদেশ জাসদ : বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরিফ নুরুল আম্বিয়া নড়াইল-১, বাংলাদেশ জাসদের কার্যকরী সভাপতি ও সংসদ সদস্য মঈনুদ্দিন খান বাদল চট্টগ্রাম-৮, বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান পঞ্চগড়-১ আসনে মনোনয়ন পেতে পারেন। এ ছাড়া দলটির পক্ষ থেকে রংপুর-৩ আসনে সাব্বির আহমেদকে প্রার্থী করার জন্য জোরালো দাবি জানানো হবে। বর্তমান সংসদে সরাসরি নির্বাচিত তাদের প্রতিনিধি রয়েছেন দুজন।

জানতে চাইলে শরিফ নুরুল আম্বিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বেশ কয়েকটি আসনে আমাদের যোগ্য প্রার্থী রয়েছেন। আমরা তাঁদের সবার জন্যই মনোনয়ন দাবি করব। তবে ১৪ দলে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কোনো আলাপ হয়নি।’

জাতীয় পার্টি-জেপি : জাতীয় পার্টি জেপির চেয়ারম্যান ও পানি সম্পদমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু পিরোজপুর-২, কুড়িগ্রাম-৪ আসনে রুহুল আমিন মনোনয়ন পেতে পারেন। এ ছাড়া দলটির পক্ষ থেকে আরো ২০-২২ জন নেতাকে ১৪ দলের মনোনয়ন দেওয়ার জোরালো দাবি জানানো হবে। এ তালিকায় বেশ কয়েকজন সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রয়েছেন। বর্তমান সংসদে জেপির প্রতিনিধি রয়েছেন দুজন।

জানতে চাইলে জেপির মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর আমাদের বর্ধিত সভা। এ সভায় আমাদের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার বিষয়ে আলোচনা হবে। এরপর জোটের সঙ্গে আলাপের পর সিদ্ধান্ত হবে কারা কারা নির্বাচনে অংশ নেবেন।’

তরীকত ফেডারেশন : তরীকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী চট্টগ্রাম-২, তরীকত ফেডারেশনের সাবেক মহাসচিব ও সংসদ সদস্য এম এ আউয়াল লক্ষ্মীপুর-১ আসনে মনোনয়ন পেতে পারেন। এ ছাড়া তরীকত ফেডারেশনের মহাসচিব সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরী কুমিল্লা-৮ অথবা কুমিল্লা-৯, তরীকত ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ তৈয়বুর বশর মাইজভাণ্ডারী চট্টগ্রাম-৪ ও মোহাম্মদ আলী ফারুকীকে চট্টগ্রাম-৯ আসনে মনোনয়নের জন্য ১৪ দলের প্রধান শরিক আওয়ামী লীগের কাছে জোরালো দাবি জানাবে। এ ছাড়া বিএনপির সাবেক দুজন সংসদ সদস্য তরীকত ফেডারেশনে যোগ দিয়ে আগামী নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হতে পারেন।

জানতে চাইলে তরীকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমান সংসদে আমাদের দুজন এমপি রয়েছেন। আগামী নির্বাচনে আরো কয়েকটি আসন দাবি করব। আশা করি, অন্তত চার-পাঁচটি আসন পাব।’

১৪ দলের অন্য শরিকদের প্রার্থী : সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া চট্টগ্রাম-১ আসনে মনোনয়ন চাইবেন। অবশ্য সেখানে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী প্রার্থী, দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও পূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন রয়েছেন। সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ এ আসনটি হাতছাড়া করবে না। এ ছাড়া গণতন্ত্রী পার্টি, ন্যাপ, কমিউনিস্ট কেন্দ্র, বাসদ, গণআজাদী লীগের মতো দলগুলোর এক-দুজন নেতাকে ১৪ দলের প্রার্থী হিসেবে দেখা যেতে পারে।

শর্টলিংকঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *