শেখ হাসিনা জিম্মি হয়ে পড়েছেন

মাস কয়েক পরেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনী হাওয়া বইছে রাজনীতির মাঠ থেকে চায়ের টেবিলে। সে আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে জোট গঠন, জোট ভাঙনের প্রসঙ্গও। সম্প্রতি বামপন্থী আটটি দল নিয়ে বাম গণতান্ত্রিক জোট গঠন করা হয়েছে। আবার হঠাৎ করেই ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বৈঠকে মিলিত হলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতির সঙ্গে। ওই বৈঠকও রাজনীতির আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

নয়া জোট গঠন এবং রাজনীতির নানা প্রসঙ্গ নিয়ে সম্প্রতি জাগো নিউজ’র মুখোমুখি হন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের শেষটি থাকছে আজ।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

শিক্ষার মাধ্যমও নির্বাচন। ক্ষেত্রবিশেষে নির্বাচনে অংশ না নেয়াও সংগ্রামের অংশ

জাগো নিউজ : চলমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করবেন না বলে আগের পর্বে বলেছিলেন। আওয়ামী লীগ যদি নীতির পরিবর্তন করে আপনাদের পাশে চায়?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : তাত্ত্বিকভাবে আপনি বলতেই পারেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। লুটেরা, ধনিক শ্রেণি যদি কোনো দল পরিচালনা করে, তাহলে সেটার ভেতর থেকে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগ যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্যাডার বাহিনী দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, তাদের গায়ে হাত দেয়ার ক্ষমতা দলটির নেতৃত্বের নেই। একই অবস্থা বিএনপির ক্ষেত্রেও।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বে ব্যবস্থা নিতে গেলেই সালাম দিয়ে বলবে, আমরা ম্যাডামের দিকে গেলাম। আর ম্যাডাম ব্যবস্থা নিতে চাইলে সালাম দিয়ে বলবে, আমরা আপার দিকে গেলাম। দুটো দলের নিচের দিকে সন্ত্রাস, ক্যাডার বাহিনী এবং নিচের দিকে লুটেরা, ধনিক শ্রেণি দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শক্তির কাছেও তারা জিম্মি হয়ে পড়েছে।

জাগো নিউজ : আওয়ামী লীগ জোটে আছে ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ। আপনাদের কর্মসূচিতে তারাও আসে। তাদের সঙ্গে কোনো বোঝাপড়া?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদ আর আমাদের কর্মসূচিতে আসে না। তারা এখন ভোগবাদী রাজনীতির সঙ্গে মিলে গেছে। আওয়ামী লীগের অপরাধ ও লুটতরাজের প্রতি তাদের সমর্থন রয়েছে। সুতরাং ইনু বা মেনন সাহেবদের সঙ্গে বোঝাপড়ার প্রশ্নই আসে না।

জাগো নিউজ : রাজনীতির বাজারে গুঞ্জন, ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে জোটের আলোচনা হচ্ছে আপনাদের অথবা বিশেষ কৌশলে নির্বাচনে যাচ্ছেন। আসলেই কি গুঞ্জন?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : গুঞ্জন নয়, এটি গুজব। বামপন্থী শক্তির মধ্যে ফাটল ধরাতেই এমন গুজব রটানো হচ্ছে। এমন আলোচনার কোনো সত্যতা নেই। আমরা বাম গণতান্ত্রিক বলয়কে শক্তিশালী করতে এখন ঐক্যবদ্ধ।

জাগো নিউজ : ঐক্যবদ্ধের কথা বলছেন। কিন্তু বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সিপিবি-বাসদ আলাদা প্রার্থী দিয়েছে…

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের ধারাবাহিকতা নয়, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা জরুরি

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : আমরা আগে থেকেই প্রার্থী দিয়েছিলাম। বাসদকে জানানোর পর তারা বললো, প্রচারের জন্য প্রার্থী দাঁড়িয়েছে। তবে পরে আর প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেনি।

মূলত আমরা জোটবদ্ধ হওয়ার আগেই নির্বাচনটি চলে আসে। আমরা সারাদেশের প্রার্থী নিয়ে এখনও চূড়ান্ত ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারিনি। আরেকটু সময় লাগবে। সিপিবি-বাসদ মিলে একটি সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে সংসদ নির্বাচনের প্রার্থিতা বাছাইয়ের জন্য। ১৪০টির মতো আসনে আমরা ঐকমত্যে পৌঁছেছি। বাম-মোর্চার সঙ্গে জোট হওয়ার পর নতুন করে আলোচনা হবে।

বরিশালে বামপন্থীদের একাধিক প্রার্থী নিয়ে মিডিয়ায় আলোচনা হয়, অথচ সব জায়গাতেই ডানপন্থী, মধ্যপন্থীদের একাধিক প্রার্থী। তা নিয়ে আলোচনা হয় না।

জাগো নিউজ : আলোচনা তো হচ্ছে…

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : ঢাকায় আমাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়ে জোনায়েদ সাকিকে সমর্থন দিয়েছিলাম। দক্ষিণেও বাসদকে সমর্থন দিয়েছিলাম। আমরা ঐক্যবদ্ধ হচ্ছি বৃহৎ স্বার্থে, মানুষের স্বার্থে। মিডিয়া আমাদের শুভ সংবাদ নিয়ে আলোচনা করে না। নেতিবাচক কিছু ঘটলেই ঝড় ওঠে।

জাগো নিউজ : নির্বাচনী ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করছেন আপনারা। এমন নির্বাচনে অংশ নিয়ে আসলে কী অর্জন করছেন?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : নির্বাচন শুধু সরকার গঠনের জন্যই নয়। নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এটিই একমাত্র উদ্দেশ্য নয়।

নির্বাচন একটি মাধ্যম যার মধ্য দিয়ে একটি জনগোষ্ঠীকে সচেতন করে তোলা যায়। শিক্ষার মাধ্যমও নির্বাচন। ক্ষেত্রবিশেষে নির্বাচনে অংশ না নেয়াও সংগ্রামের অংশ, ২০১৪ সালে আমরা করেছিলাম। নির্বাচন বর্জন আওয়ামী লীগও করেছে, বিএনপিও করেছে।

নির্বাচনে প্রহসনের যে মাত্রা যোগ হয়েছে, তার খেসারত আওয়ামী লীগকেও দিতে হবে। আমরা নির্বাচনে অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের চরিত্র উন্মোচন করছি।

ব্যালট ছিনতাই, কেন্দ্র দখল, সংঘর্ষ আগে দেখেছি। কিন্তু শেখ হাসিনা এখন ম্যাজিক নির্বাচন করছেন। বাইরে ভোটার দাঁড়িয়ে, ভোটও দিচ্ছে। কিন্তু ফলাফল ঘোষণা করা হচ্ছে নীল নকশায়। মিডিয়াও কাজ করতে পারছে না। মিলিটারি পর্যবেক্ষণের মতো মিডিয়াকে সামলানো হচ্ছে। নানা অভিনব কায়দায় ভোট জালিয়াতি হচ্ছে। নির্বাচনে টাকার খেলাই এসব করতে সহায়তা করছে। আমরা এ জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে বিপদ আরও বাড়বে।

জাগো নিউজ : এই ভোট, এই নির্বাচন আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সরকার তো বলছে, আগে উন্নয়ন পরে ভোট, গণতন্ত্র। উন্নয়নের নামে কতিপয় ব্যক্তির অর্থ উপার্জনের সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে, আর সাধারণ মানুষ আরও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। এ বৈষম্য টিকিয়ে রাখা হচ্ছে তাদের ক্ষমতা ধরে রাখার স্বার্থেই।

তারা এখন থিউরি এনেছেন, আগে উন্নয়ন পরে গণতন্ত্র। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে। এ জন্য সরকারের ধারাবাহিতকা রক্ষা করতে হবে। এর অর্থ হচ্ছে, চিরদিন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকবে। বুঝে আসছে না, আওয়ামী লীগকে এ থিউরি বাস্তবায়নের ঠিকাদারি কে দিলো!

চলমান উন্নয়নের ধারাবাহিকতা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী। এ উন্নয়ন সমাজে বৈষম্য বৃদ্ধি করছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের ধারাবাহিকতা নয়, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা জরুরি। অথচ সরকার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে দিয়ে স্লোগান দিচ্ছে, সরকারের ধারাবাহিকতা দরকার।

জাগো নিউজ : এর ফলাফল কী হতে পারে?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সরকারের এ খায়েস কোনোদিনই পূরণ হবে না। সমাজে অস্থিরতা তো বাড়ছেই। দু’দিক থেকে নৈরাজ্য বাড়ছে। শাসকদের মধ্যকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্ব, হাঙ্গামা হচ্ছে। অন্যদিকে কেউ খাবে, কেউ খাবে না- এমন দ্বন্দ্বও তীব্র হচ্ছে।

জাগো নিউজ : সমাধান কোথায়?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করেছিল, তা পূরণের মধ্য দিয়েই সমাধান মিলবে।

জাগো নিউজ : তাহলে তো আরেকটি যুদ্ধ অনিবার্য…

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : অবশ্যই। মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করতে একটি নব অধ্যায়ের সূচনা করতে হবে। আর সেটি হচ্ছে যুদ্ধ।

জাগো নিউজ : ভরসা কোথায়?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : জনগণ। সবাই মাঠে নামবে একদিন আর এটিই আমাদের ভরসা। অতীতেও সাধারণ মানুষই মুক্তির নিশানা দেখিয়েছে। এখনও তাই দেখাবে। দর্শক হয়ে বসে থাকার আর সময় নেই।

জাগো নিউজ : কয়লা গায়েব! জ্বলানি সম্পদ রক্ষায় আন্দোলন করছেন। কী দেখলেন, বড়পুকুরিয়ায়?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : কয়লা গায়েবের বিষয়টি আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। সরকার লুটপাটের ধারা তৈরি করেছে, তারই অংশ বড়পুকুরিয়ায়। আমার মনে আছে, কম্বল চুরি নিয়ে বঙ্গবন্ধু নালিশের সুরে নানা বক্তব্য দিয়েছেন। সমাবেশেও কম্বল চুরির বিষয়ে বলেছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার কথা বলেছেন। অথচ শেখ হাসিনা ব্যাংক ডাকাতি, কয়লার পাহাড় চুরি নিয়ে কোনো কথা বলেন না। মূলত চোরদের কাছে শেখ হাসিনা জিম্মি হয়ে পড়েছেন।

আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার ওপর নির্ভর করে চলার আর কোনো সুযোগ নেই। এমন দুঃশাসনে আস্থা রাখলে দেশ চিরতরে পথ হারাবে। জনগণ গ্যালারি ছেড়ে মাঠে নামলেই সমাধান মিলবে। কারণ রাজনীতির মাঠ জনগণের হাতেই রাখতে হয়।

জাগো নিউজ : জনগণ তো দেখেই যাচ্ছে…

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : অবশ্যই মাঠে নামবে। ফুলবাড়ির কয়লা জনগণই রক্ষা করেছে। গার্মেন্টস নিয়ে আন্দোলন দেখছি। কোটাবিরোধী আন্দোলন দেখতে পেলেন। যৌন নিপীড়নবিরোধী আন্দোলনে মানুষ অংশ নিচ্ছে। বিচ্ছিন্নভাবে আন্দোলন হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে আন্দোলন করলেই সমাধান আসবে।

জাগো নিউজ : এই প্রশ্নে আপনাদের নেতৃত্বে ব্যর্থতা আছে কিনা?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : ব্যর্থতা বলছি না। তবে আমি মনে করি, সামগ্রিক আন্দোলনের জন্য এখনও সেই সক্ষমতা বামপন্থীদের আসেনি।

সংগ্রাম, আন্দোলনে মানুষকে পাশে পাচ্ছি কিন্তু ভোটে পাচ্ছি না। ভোটের মাঠে সফলতা আরও কঠিন। মূলত যারা পর্দার আড়ালে থেকে কলকাঠি নাড়েন, তাদের কারণেই মানুষ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। দেশি-বিদেশি শক্তি চায় দ্বি-দলীয় শক্তি ভোটের মাঠে জিইয়ে থাকুক। তাদের স্বার্থ রক্ষার্থেই আওয়ামী লীগ-বিএনপিকে টিকিয়ে রাখা।

তবে কেউ চাইলেও এই অসচলায়তন ভাঙবে, না চাইলেও ভাঙবে। এই চাপা অস্থিরতা দীর্ঘদিন চলতে পারে না।

উৎসঃ   jagonews24
, , , , , , , , , , , , , ,
শর্টলিংকঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *