মহাবিপদে যে মুসলিমরা

ফরহাদের স্ত্রী মরিয়ম বেড়াতে গিয়েছিলেন তাঁর বাপের বাড়ি। এ নিয়ে ফরহাদের মনে কোনো দুর্ভাবনা ছিল না। কিন্তু বউয়ের কাছ থেকে যখন মোবাইল ফোনে একটা খুদে বার্তা পেলেন, মাথা ঘুরে গেল তাঁর। খুদে বার্তায় লেখা, ‘পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।’

সেটা ২০১৭ সালের মার্চের ঘটনা। সেই থেকে প্রায় দেড় বছর ধরে ফরহাদ (৩৯) স্ত্রী মরিয়মকে (৩১) ফিরে পাওয়ার আশায় দিন গুনছেন। মা নিখোঁজ থাকায় ছন্নছাড়া অনাথের মতো জীবন কাটাচ্ছে তিন শিশু সন্তান।

গার্ডিয়ানে ১৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ‘মাই সোল, হোয়ার আর ইউ’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর চীনের উত্তর-পশ্চিম স্বায়ত্তশাসিত এলাকা শিনচিয়াংয়ের আরতুশ থেকে মরিয়মকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। তিন সন্তানসহ ফরহাদ এ সময় প্রতিবেশী দেশ কাজাখস্থানে অবস্থান করছিলেন। এখনো সেখানেই রয়েছেন তিনি।

নিখোঁজ হওয়ার পর এপ্রিল পর্যন্ত মরিয়মের কাছ থেকে ছাড়া ছাড়া বার্তা আসত ফরহাদের কাছে। তাঁর মনে হয়েছে, কোনো বন্দিশিবিরে রাখা হয়েছে মরিয়মকে। এপ্রিলেই পাঠানো এক বার্তা পাঠান, ‘আমাকে আরেক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’

নিরুপায় ফরহাদ লিখে পাঠান, ‘বলো জান, আমি কী করব?’

জুনে একটি হাসপাতাল থেকে শেষ বার্তা পাঠান মরিয়ম। ওতে লেখা ছিল, ‘আমার জন্য তোমাকে কিছু করতে হবে না। ভুলেও চীনে এসো না। আমাকে আর খুঁজো না।’

মরিয়ম ও ফরহাদের অসমাপ্ত গল্প এটুকুই। এমন ঘরছাড়া, দেশছাড়া, যাযাবর জীবনে তরস্ত হরিণের মতো জীবন কাটাচ্ছেন হাজারো ফরহাদ-মরিয়ম। কারণ, তাঁরা উইঘুর মুসলিম।

আগস্টে প্রকাশিত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক এক প্রতিবেদন উল্লেখ করা হয়, শিনচিয়াংয়ে ১০ লাখের বেশি উইঘুর মুসলিমকে সন্ত্রাসবিরোধী শিবিরে রেখে নির্যাতন করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। জেনেভায় চীনা কর্মকর্তাদের এ নিয়ে তিরস্কারও করা হয়।

অভিযোগ অস্বীকার করে চীনা কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলেছে, এসব শিবিরে কাউকে বন্দী করে রাখা হয়নি। কোনো নির্যাতনও চলছে না, চলছে সন্ত্রাসবিরোধী শিক্ষা কার্যক্রম।

বাস্তবে উইঘুর মুসলিমদের জীবন ফাঁদে আটকে পড়া ইঁদুরের মতো। নামাজের সময় আজান দেওয়া যাবে না। শুধু তা–ই নয়, কেউ যাতে নামাজ আদায় করতে না পারে, এ জন্য ভেঙে ফেলা হয়েছে শত শত মসজিদ। এসব স্থানে গড়ে তোলা হচ্ছে নতুন নতুন ভবন আর স্থাপনা। আগে যেসব স্থানে মসজিদ ছিল, সেসব অনেক স্থানেই এখন গড়ে উঠেছে পর্যটনকেন্দ্র।

মুসলিম কোনো শিশু মাদ্রাসা-মক্তবে গিয়ে পবিত্র কোরআন পাঠ বা নামাজ-কালাম শিখবে, সে পথও বন্ধ। তাদের বাধ্য করা হচ্ছে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে প্রচলিত কায়দায় পড়াশোনা করতে।

সরকারি অফিসে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের নামাজ-রোজা পালনে রয়েছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা। ঘরের ভেতর মুসলিম নারী-পুরুষ কে কী করছেন, সে হিসাবও রাখা হচ্ছে সরকারি নথিতে। ঈদের উৎসব পালন বা কোরবানি করার নাম কেউ নিয়েছে তো মরেছে। হাতকড়া লাগিয়ে সোজা কয়েদখানায় পুরে দেবে।

এমন কোনো পোশাক পরা যাবে না বা সাজসজ্জায় এমন কিছু থাকা যাবে না, যা মুসলিম ঐতিহ্যকে তুলে ধরে। রাখা যাবে না লম্বা দাড়ি, পরা যাবে না বোরকা বা নেকাব কিংবা আপাদমস্তক ঢাকা কোনো পোশাক।

এক কথায়, সেখানে মহাবিপদে আছে সেই মুসলিমরা। চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত শিনচিয়াং প্রদেশে বাস এই সংখ্যালঘু মুসলিমদের। চীন সরকারের করতলে থাকা ওই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের প্রধান জনগোষ্ঠী কিন্তু তারাই। তারা কেবল এই ধর্মীয় নিপীড়নের জাঁতাকলেই নিষ্পেষিত নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক হেনস্তাও রয়েছে। আছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনা।

শিনচিয়াং চীনের সীমান্তবর্তী বৃহত্তম অঞ্চল। এর আয়তন ১৬ লাখ ৬৪ হাজার ৮৯৭ বর্গকিলোমিটার। শিনচিয়াংয়ের সীমান্ত ছুঁয়ে গেছে বড় বড় আটটি দেশ। এগুলো হচ্ছে রাশিয়া, কিরগিজস্তান, কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান, মঙ্গোলিয়া, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান। এত বড় অঞ্চলের তুলনায় লোকসংখ্যা অনেক কম। বিবিসির সাম্প্রতিক তথ্যে বলা হয়েছে, সেখানকার লোকসংখ্যা ১ কোটি ৯০ লাখ। এর অর্ধেকই উইঘুর মুসলিম, যারা হাজারো বছর ধরে সেখানে বাস করে আসছে।

শিনচিয়াং কেবল আয়তনেই বড় নয়, এটি প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদে ভরপুর। পাহাড়-পর্বত, মরু প্রান্তর, সুফলা ভূমি—সবই আছে এই বিশাল জনপদে। এটি একদিকে যেমন কৃষিসম্পদে সমৃদ্ধ, তেমনি রয়েছে পশুপালনের বিশাল চারণভূমি। আছে সোনা ও ইউরেনিয়ামের মতো মূল্যবান ধাতব পদার্থের খনি। আছে তেল ও গ্যাসের অফুরান সম্পদ। কাজেই কমিউনিস্ট–শাসিত চীনের কাছে অতি লোভনীয় এই ভূখণ্ড। সেখানে কেবল স্বায়ত্তশাসনেই তুষ্ট নয় চীন। আদি বাসিন্দা উইঘুরদের ঝাড়ে-বংশে নিপাত করতে পরলেই যেন স্বস্তি মিলবে প্রশাসনের। ভাবগতিকে তা–ই।

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মানুষের দেশ চীনে মুসলিম সংখ্যা নেহাত কম নয়। আড়াই কোটির কাছাকাছি। একদিকে রয়েছে ‘হুই’ ও অন্যরা এবং আরেক দিকে ‘উইঘুররা’। হুইরা হলো ভিনদেশি মুসলিম, যারা ইরাক, ইরান, সিরিয়া—এসব দেশ থেকে এসে বসতি গড়েছে। এসব মুসলিম অনেকে আবার চীনা বংশোদ্ভূত হান মেয়ে বিয়ে করায় তারা মিশ্র পরিবার গড়ে তুলেছে।

উইঘুরদের বিক্ষোভ। ছবি: রয়টার্স

উইঘুরদের বিক্ষোভ। ছবি: রয়টার্স

আর উইঘুররা স্থানীয় কাশগরসহ আশপাশের মানুষ, যার এ মাটিরই সন্তান। তারা সুন্নি মুসলিম। ঐতিহাসিক সিল্ক রুটের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নিবিড়। প্রতিবেশী কাজাখ, তাজিক, কিরগিজ ও আফগানদের সংস্কৃতির সঙ্গে বেশ মিল তাদের। তাদের ভাষা তুর্কি। চীনের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার আগে এই বিশাল ভূখণ্ড উইঘুরিস্তান বা পূর্ব তুর্কিস্তান নামে পরিচিত ছিল। এখনো অনেক উইঘুর শিনচিয়াংকে পূর্ব তুর্কিস্তান বলে থাকে। তাদের ইতিহাস বেশ ঘটনাবহুল, যা দু-চার কথায় শেষ করা সম্ভব নয়।

ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে চীনের মাঞ্চু শাসকেরা উইঘুরদের সুবিশাল এই এলাকা দখল করে নেয়। ২০০ বছর পরাধীনতার শিকলে থাকার পর মাঞ্চুদের বিতাড়নে ফিরে আসে স্বাধীনতা। ১৮৭৬ সালে চীন আবার ওই অঞ্চল দখল করে নাম দেয় শিনচিয়াং। এ নামের অর্থ হলো ‘নতুন ভূমি’। সেই থেকে উইঘুররা মূলত পরাধীন।

গত শতকের চল্লিশের দশকে উইঘুররা যাওবা একটুখানি স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছিল, তা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৪৯ সালে স্বাধীন ভূমি পূর্ব তুর্কিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলেও তা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। একই বছর কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় আসার পর শিনচিয়াং পুনরায় চীনের দখলে চলে যায়। চীনা শাসকেরা এখানে প্রতিষ্ঠা করে তথাকথিত স্বায়ত্তশাসন। এখন এটা ‘শিনচিয়াং উইঘুর অটোনোমাস রিজিয়ন’ নামে পরিচিত। তবে স্বায়ত্তশাসন নামেই, ভেতরে চলছে কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ। সে চিপুনিতে উইঘুরদের জীবন জেরবার।

উইঘুরদের সঙ্গে চীন সরকারের বিরোধ অনেক কিছুতেই। কমিউনিস্ট সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে শিনচিয়াংয়ের সম্পদ সব পুরোমাত্রায় কাজে লাগানো। এ জন্য স্বায়ত্তশাসিত ওই প্রদেশে তাদের বিনিয়োগও প্রচুর। চীনের রাষ্ট্রীয় পত্রিকা চায়না ডেইলির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর শিনচিয়াংয়ে অবকাঠামো উন্নয়নে সরকার সাত হাজার কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করছে। ২০১৭ সালে সেখানে বিনিয়োগ বৃদ্ধির হার ১৯ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ রয়েছে।

চীন অনেক আগেই টের পেয়েছিল যে শিনচিয়াংরের সোনার মাটিতে একদিন টাকার গাছ জন্মাবে, প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ থেকে আসবে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। এই টাকা বিলি-বন্দোবস্ত করতে লাগবে স্থানীয় বিশ্বস্ত লোক। কিন্তু উইঘুর লোকজনের ওপর আস্থা রাখতে পারেনি কেন্দ্রীয় সরকার। এখানে মূল সংঘাত ধর্ম এবং সামাজিক সংস্কৃতি। প্রতিবেশী কাজাখ, তাজিক ও আফগানদের মতোই উইঘুররা ধর্মপ্রাণ ও সাহসী। একই সঙ্গে স্বাধীনচেতাও। পূর্বপুরুষের যে মাটিতে তারা যুগ যুগ ধরে বাস করে আসছে, সেখানে চীনা কমিউনিস্ট সরকার তাদের কাছে অনাহূত দখলদারের মতো। কেবল স্বায়ত্তশাসনেই তারা তুষ্ট নয়। চায় পুরোপুরি স্বাধীনতা।

এদিকে চীন দেশটাই সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের। তাদের ধর্মীয় রীতিনীতি, খাওয়াদাওয়া, চলাফেরার সঙ্গে মুসলিম সমাজে প্রচলিত সংস্কৃতির ব্যবধান বিশাল। উইঘুরদেরই বরং তারা অনাহূত ভাবে। এই সংখ্যালঘু অবর জাতি এখানে পড়ে আছে কেন?

ব্যস, দেখা দিল আস্থার সংকট। উইঘুরদের জায়গায় হানদের এনে ঢোকাতে লাগল সরকার, যারা মূলত বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। আজ থেকে ৫০ বছর আগেও শিনচিয়াংয়ে হানদের সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য, মাত্র ৫ শতাংশ। বর্তমানে দ্রুত বাড়ছে হানদের সংখ্যা। শিনচিয়াংয়ে এখন ৪০ শতাংশই হান। হানদের চাপে ওই অঞ্চলের মূল বাসিন্দা উইঘুরদের নাম উঠে গেছে সংখ্যালঘুর তালিকায়।

সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে উইঘুর ও হানদের মধ্যে বৈষম্য প্রবল। বড় বড় সরকারি চাকরি, জমজমাট ব্যবসা, কলকারখানা—সবই এখন হানদের দখলে। তাদের টেনে তোলার বেলায় সরকারের সহযোগিতা রয়েছে ষোলো আনা। অন্য দিকে বৈষম্য, হেনস্তা আর নিপীড়ন চলছে উইঘুরদের ওপর।

হানরা তুলনামূলকভাবে শিক্ষিত ও কারিগরি দিক দিয়ে অধিক দক্ষ হওয়ায় উইঘুরদের ডিঙিয়ে সহজেই সমাজের শীর্ষ আসনগুলো দখল করে নিচ্ছে। সরকারি চাকরি ও সামাজিক অবস্থানের দিক দিয়ে উইঘুররা ক্রমে নিচের দিকে নামছে। রাজধানী উরুমকিসহ নগরকেন্দ্রিক জীবনে হানদেরই এখন রাজত্ব। অন্যদিকে, কাশগরসহ ঐতিহাসিক প্রাচীন স্থানগুলোয় সংখ্যায় বেশি উইঘুররা, যারা নির্যাতিত জীবন কাটাচ্ছে।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের একাধিক প্রতিবেদনে উইঘুরদের ওপর সরকারের নিপীড়ন ও অবদমনের তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৭ সালের এপ্রিলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২৯টি নামের এমন এক তালিকা প্রকাশ করা হয়, যেসব নাম উইঘুর শিশুদের জন্য রাখা যাবে না। যেমন: সাদ্দাম, ইসলাম, ইমাম, জিহাদ ইত্যাদি।

এইচআরডব্লিউয়ের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিনচিয়াংয়ে উইঘুর মুসলিমদের বাড়ি কিউআর কোডসংবলিত নজরদারিব্যবস্থা স্থাপন করা হচ্ছে। এটি ‘কুইক রেসপন্স’ কোড বলে পরিচিত। উইঘুর লোকজনের পারিবারিক খুঁটিনাটি তথ্য জোগাড়ে এই সাংকেতিক ব্যবস্থা স্মার্টডোর প্লেটে স্থাপন করা হচ্ছে। ওই বাড়িতে কে এল, কে গেল, অচেনা কেউ এল কি না, এসব তথ্য দেবে স্মার্টডোর প্লেট।

উইঘুরদের ওপর অবশ্য চীনা প্রশাসনের সন্দেহের এই ছড়ি ঘোরানোর বিষয়টি নতুন নয়। বিশেষ করে স্বাধীনতার দাবিতে উইঘুররা সরব হওয়ার পর থেকে চলছে এই দমন–পীড়ন। ক্রমে তা সাঁড়াশির চাপ হয়ে বসছে। সরকারি পরিসংখ্যানের কথা উল্লেখ করে মানবাধিকার সংগঠন চায়না হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার্স বলছে, ২০১৭ সালে শিনচিয়াংয়ে প্রায় ২ লাখ ২৮ হাজার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা প্রায় সবাই উইঘুর মুসলিম। এর মধ্যে কিছু কাজাখ ও অন্যান্য মুসলিমও রয়েছে।

সন্ত্রাসবিরোধী সেনা অভিযানের আওতায় এই বড় ধরনের গ্রেপ্তারি কর্মকাণ্ড চলে। চীন বলছে, মুসলিম উগ্রপন্থী বিচ্ছিন্নবাদীরা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তাদের দমনেই এই অভিযান।

স্বাধীনতার দাবিতে শিনচিয়াংয়ে ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্ট নামের একটি ইসলামি সংগঠন আছে বটে, স্থানীয়ভাবে যা সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন বলে পরিচিত। তবে এর কর্মকাণ্ড এখন সীমিত। আর প্রতিষ্ঠাতা হাসান মাসুমও অনেক আগেই নিহত হয়েছেন।

গত বছর সন্ত্রাসী সংগঠন আইএসের একটি ভিডিও প্রকাশিত হওয়ার পর মূলত চীন সরকার উইঘুরদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন শুরু করে। এই ভিডিও দেখানো হয়েছে যে উইঘুর শিশু-কিশোররা আইএসের শিবিরে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। সেখানে দুটি শিরশ্ছেদ দেখানো হয়। এ ছাড়া সিরিয়া ও ইরাকের যুদ্ধে উইঘুর যোদ্ধাদের অংশ নেওয়ার বিষয়ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এসেছে। এরপর থেকে হাজারো সেনা শিনচিয়াংয়ে মোতায়েন করা হয়। এখন চলছে শারীরিক, মানসিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে উইঘুরদের পঙ্গু করে দেওয়ার কর্মকাণ্ড।

এর মধ্যে অনেক উইঘুর প্রতিবেশী মুসলিম দেশগুলোয় আশ্রয় নিয়েছে। শিক্ষিত অনেক উইঘুর চলে গেছে পশ্চিমা দেশে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে যেমন লাখো রোহিঙ্গাকে ঝেড়েপুঁছে বিদায় করা হয়েছে, শিনচিয়াংয়ে সে রকম সেনা অভিযান না চললেও এমন পরিস্থিতি সরকার তৈরি করেছে যে উইঘুর মুসলিমরা যেন দেশান্তরে বাধ্য হয়।

চীনের এই অন্যায় দমন-পীড়ন ও ধর্মীয় অবমাননার ঘটনার প্রতিবাদে সোচ্চার বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। চীনের সংবিধানের পরিষ্কার উল্লেখ রয়েছে, সেখানকার প্রতিটি মানুষ নিজের ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে। মার্কিন প্রশাসন এর মধ্যে চীনের ওপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার আরোপেরও হুমকি দিয়েছে। কিন্তু এসব হুমকি-ধমকি বাস্তবে তেমন ফল বয়ে আনে না। কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান মূলত নির্ভর করে সে দেশের সরকারের সদিচ্ছার ওপর। এর জ্বলন্ত উদাহরণ মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকট।

কে জানে, হয়তো এমন দিন আসবে, যেদিন শিনচিয়াংয়ে উইঘুর মুসলিমদেরও বরণ করতে হবে রোহিঙ্গা মুসলিমদের মতো নির্মম ভাগ্য। পূর্ব তুর্কিস্তান নামের একটি স্বপ্নের দেশে এককালে বাপ–দাদার ভিটা ছিল, ছিল শৈশব-কৈশোরের স্বপ্নময় দিন—এই স্মৃতি ঘুর ঘুর করবে উইঘুরদের মনের নিভৃত ছায়ে। আর তারা যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়াবে দেশ থেকে দেশান্তরে।

শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া: লেখক, সাংবাদিক

sharifrari@gmail.com

উৎসঃ   prothomalo
শর্টলিংকঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *