ভূমিমন্ত্রীর এলাকায় বরাদ্দ লুটপাটের মহোৎসব

অভিযুক্তরা মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন

ভূমিমন্ত্রীর এলাকায় বরাদ্দ লুটপাটের মহোৎসব

মসজিদ, মন্দির, কবরস্থান সংস্কারের টাকাও আত্মসাৎ * ঈশ্বরদীতে মন্ত্রীর এপিএস বকুল ও আটঘরিয়ায় আওয়ামী লীগ নেতা মুকুল পালের গোদা * পাবনার ডিসি বললেন, ‘ভুয়া প্রকল্পের কারণে আমি ৪শ’ টন বরাদ্দ ফেরত দিয়েছি, এজন্য আমার ওপর অনেকেই বিরক্ত’

  নেসারুল হক খোকন, ঈশ্বরদী (পাবনা) থেকে

 

 ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফের নির্বাচনী এলাকায় সরকারি বরাদ্দ লুটপাটের মহোৎসব চলছে। অভিযোগের তীর খোদ মন্ত্রীর পরিবারের দিকে। বাদ যাননি তার এপিএস বশির আহমেদ বকুলও। অন্যতম সহযোগী হিসেবে রয়েছেন ঈশ্বরদীর আটঘরিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম মুকুল।

বলা হচ্ছে, মন্ত্রীর প্রচ্ছন্ন সমর্থনে প্রভাবশালী এ চক্রের কব্জায় থাকে টিআর, কাবিখা, কাবিটাসহ সরকারি বিভিন্ন বরাদ্দের সিংহভাগ। যৎসামান্য কাজ করে পুরোটাই করে ভাগাভাগি। শুধু গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য রাস্তাঘাটের বরাদ্দ নয়, মসজিদ, মন্দির, ঈদগাহ ও কবরস্থান সংস্কারের বরাদ্দ নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ মিলেমিশে জায়েজ করা হয়। এছাড়া ভুয়া প্রকল্প তো আছেই। যার পুরোটাই আত্মসাৎ।

এসব অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাও রেহাই পাননি। তাদের ওপর হামলা-মামলাও করা হয়েছে। তবে প্রশাসনের সহায়তা ছাড়া এভাবে সরকারি বরাদ্দের টাকা আত্মসাৎ করার সুযোগ নেই। সঙ্গতকারণে এই লুটপাটের অংশীদার জেলা ও উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তাসহ একটি চক্র।

সপ্তাহব্যাপী যুগান্তরের সরেজমিন অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে লুটপাটের আদ্যোপান্ত— ও ভয়াবহ সব তথ্য। যুগান্তরের কাছে সংরক্ষিত আছে বরাদ্দ এলাকার ইউপি চেয়ারম্যানসহ তৃণমূল আওয়ামী লীগ নেতাদের দেয়া সাক্ষাৎকারের অডিও ভিডিও। তারাই তুলে ধরেছেন প্রকল্পের নামে দুর্নীতির লম্বা ফিরিস্তি। তাদের অভিযোগ পরিবারতন্ত্র কায়েম করতে গিয়ে ঘর-বাহির কোনোটাই সামাল দিতে পারেননি মন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ। উল্টো দলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা পদে পদে লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত হয়েছেন।

এ অবস্থায় নির্বাচনের কয়েক মাস বাকি থাকতে মন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা ঈশ্বরদী-আটঘরিয়ার মানুষ ফুঁসে উঠেছেন। আগামী নির্বাচনে তারা এ পরিবার থেকে আর কাউকে দেখতে চান না। বরং যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতির টাকায় সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তাদের বিরুদ্ধে দুদকের শক্ত তদন্ত ও বিচার দাবি করেন অনেকেই।

ঈশ্বরদী পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইসহাক মালিথা যুগান্তরকে বলেন, ‘সরকারি বরাদ্দ কালোবাজারে বিক্রি ও নিয়োগ বাণিজ্য করে বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তি ও তার পরিবারের সদস্যরা। শুধু তাই নয়, সরকারি বরাদ্দ ও নিয়োগ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য দুই উপজেলায় দু’জনকে অলিখিত ক্ষমতাও দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ঈশ্বরদীর সবকিছু দেখভাল করেন মন্ত্রীর এপিএস ও খালাতো ভাই বশির আহমেদ বকুল। এছাড়া আটঘরিয়ায় রাখা হয়েছে স্থানীয় পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম মুকুলকে।’

তিনি বলেন, ‘ভূমিমন্ত্রীর পরিবারের বাইরে ‘বকুল আর মুকুল এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসবে তাদের সম্পদের প্রকৃত চিত্র। এই দু’জনকে পরিচালনা করেন ভূমিমন্ত্রীর স্ত্রী। কোনো ব্যবসা ছাড়া কীভাবে তারা এত সম্পদের মালিক হলেন তদন্ত করলেই লুটপাটের বিস্তর পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে।’

এদিকে বিভিন্ন সূত্র ও আওয়ামী লীগ নেতাদের দেয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে অনেক অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়। যুগান্তরের তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, বিদায়ী অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে প্রথম এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের বরাদ্দ ও কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে ১৫ জুলাই পাবনা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে সর্বশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এতে জেলার ৯টি উপজেলায় দেয়া বরাদ্দের বিপরীতে কাজের বাস্তব অবস্থা পর্যালোচনা করা হয়। সভায় গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে দেয়া বরাদ্দ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় ঈশ্বরদীসহ জেলার তিন উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়।

অথচ কার্যবিবরণীতে দেখা যায়, প্রতিটি কাজ শতভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে। কার্যবিবরণীর সঙ্গে প্রকল্পের নামসহ বরাদ্দের একটি তালিকাও পাওয়া যায়। ঈশ্বরদী উপজেলার দুই কর্মকর্তার প্রতি অসন্তোষের সূত্র ধরে প্রকল্প অনুযায়ী বরাদ্দের খোঁজ নিতে গিয়ে রীতিমতো সাগর চুরির ঘটনা ধরা পড়ে। এর মধ্যে ভয়াবহ চিত্র ধরা পড়ে আটঘরিয়া উপজেলার বিভিন্ন প্রকল্পে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। বুধবার তার ব্যক্তিগত মুঠোফোনে কয়েকবার ফোন করা হয়। কিন্তু তিনি রিসিভ করেননি। পরে পরিচয় দিয়ে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হয়। এরপরও কোনো সাড়া মেলেনি। পরবর্তীতে একইভাবে ভূমিমন্ত্রীর এপিএস বশির আহমেদ বকুলের বক্তব্য নেয়ার জন্য চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনিও ফোন রিসিভ করেননি।

তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ভূমিমন্ত্রীর সহধর্মিণী ঈশ্বরদী উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী কামরুন্নাহার শরীফ বুধবার বিকালে যুগান্তরকে বলেন, ‘টিআর, কাবিখাসহ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন বরাদ্দ থেকে লুটপাট হয়ে থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। অবশ্যই আমি চাই তদন্ত হোক।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ’আমি ফকির নই- যে মসজিদ, মন্দির, কবরস্থান, এতিমখানার বরাদ্দ থেকে কমিশন খেতে হবে। বরং সব সময় এসব স্থানে দান করে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।’

জানতে চাইলে পাবনা জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, ‘ভুয়া প্রকল্পের কারণে আমি ৪শ’ মে. টন টিআর ফেরত দিয়েছি। এজন্য আমার ওপর অনেকেই বিরক্ত। ভুয়া প্রকল্পের বিষয়ে আমার কাছেও অভিযোগ এসেছে। তবে আমি সবগুলো প্রকল্প তদন্ত করার ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

আটঘরিয়ার মুকুল আপনাকে টাকা দিয়ে মসজিদ, মন্দির ও কবরস্থান সংস্কারে বরাদ্দ নেন বলে এলাকায় বলে বেড়াচ্ছেন। জবাবে ডিসি বলেন, এসব বলে থাকলে তো আর সহ্য করা হবে না। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

লুটপাটের খণ্ডচিত্র : ২০১৭-১৮ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের (টিআর) আওতায় প্রথম পর্যায়ে গৃহীত একটি তালিকায় দেখা যায়, আটঘরিয়ায় মসজিদ, মন্দির, ঈদগাহ ও কবরস্থান সংস্কারের নামে ৪০টি প্রকল্পে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ কাগজ-কলমে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানকে ৩৯ হাজার ৫শ’ টাকা করে মোট ১৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়।

আটঘরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা এ বিষয়ে যুগান্তরকে বলেন, ‘গৃহীত প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্তত ৯০ ভাগ প্রতিষ্ঠানকে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়ে পুরোটাই আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ভুয়া প্রকল্প। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সঙ্গে আঁতাত করে ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফের প্রতিনিধি পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুকুল এই টাকা আত্মসাৎ করেন।’

এর প্রমাণ তালাশ করতে গিয়ে দেখা যায়, আটঘরিয়া কিন্ডারগার্টেন নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে ৩৯ হাজার ৫শ’ টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। গৃহীত প্রকল্পের নথিতে ওই কিন্ডারগার্টেন থাকলেও বাস্তবে এই নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। আটঘরিয়া পৌর মেয়র রফিকুল ইসলামও বলেছেন এই নামে তার পৌর এলাকায় কোনো প্রতিষ্ঠান নেই।

এছাড়া সংশ্লিষ্ট উপজেলার একদন্ত ইউনিয়নের ডেঙ্গারগ্রামে মরহুম জমিদার মাছিম মোল্লার কবরস্থান উন্নয়নে ৩৯ হাজার ৫শ’ টাকা বরাদ্দ দেয়ার তথ্য পাওয়া যায়। বাস্তবে খোঁজ নিতে গিয়ে কথা হয় মাছিম মোল্লার নাতনি সাবেক ইউপি সদস্য তাহমিনা সুলতানা তহুরা বেগমের সঙ্গে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তৃণমূল আওয়ামী লীগের এই কর্মী যুগান্তরকে বলেন, ‘দাদার কবরস্থান সংস্কার করতে আমি নিজেই আবেদন করেছিলাম। বরাদ্দের বিষয়টি জানতে পেরে খোঁজ নিতে গিয়ে শুনলাম আমার মামাতো ভাই পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুকুল স্বাক্ষর জাল করে সব টাকা তুলে নিয়েছেন। পরে এ নিয়ে আমি অভিযোগ করলে মুকুল আমার এক ভাইকে ১০ হাজার টাকা দেন। আর বলেন, আমাকে এক হাজার টাকা দিতে।

আমার মুখ বন্ধ করতে বিকাশ নাম্বারে এক হাজার টাকাও পাঠানো হয়।’ তহুরা বলেন, ‘প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করে শূন্যহাতে এখন কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন মুকুল। ভূমিমন্ত্রীর স্ত্রীর সঙ্গে আঁতাত করে প্রতি বছর টিআর, কাবিখাসহ এমপির বিশেষ বরাদ্দ আত্মসাৎ করা হলেও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। মুকুলকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই প্রকল্পের টাকা চুরির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে।’

এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নের স্বার্থে তাকে আইনের আওতায় আনার দাবিও জানান তিনি।

গত অর্থবছরে আটঘড়িয়া উপজেলায় বিভিন্ন ইউনিয়নে দ্বিতীয় পর্যায়ে বরাদ্দ দেয়া টিআরের আওতায় স্থানীয় এমপি ও ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফের দেয়া একটি তালিকা পাওয়া যায়। এতে দেখা গেছে, উপজেলার একদন্ত ইউনিয়নে প্রতিটিতে ৩৯ হাজার টাকা করে মসজিদ, কবরস্থানসহ ৭টি প্রকল্প করা হয়। খোঁজ নিতে গেলে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ইসমাইল হোসেন সরদার প্রতিবেদককে বলেন, ‘এগুলো সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে লাভ নেই। কোনো প্রতিষ্ঠানই টাকা পায়নি।’

এরপর তালিকা নিয়ে পরিচিতদের ফোন করে বরাদ্দের বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চান তিনি।

তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, একদন্ত ইউনিয়নের বেলদাহ মোল্লাপাড়া কবরস্থান উন্নয়নের নামে সাড়ে ৩৯ হাজার টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়। অথচ সংশ্লিষ্ট কবরস্থানের সভাপতি মোস্তফা মোল্লা জানান, তিনি কোনো টাকাই পাননি। প্রকল্প সম্পর্কেও তিনি অবগত নন। স্থানীয় চৌবাড়িয়া কমিউনিটি ক্লিনিক উন্নয়নের নামেও সাড়ে ৩৯ হাজার টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে।

ইউপি চেয়ারম্যান নিজে সংশ্লিষ্ট কমিউনিটি ক্লিনিকের দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওই ক্লিনিকে কোনো টাকা দেয়া হয়নি বলে প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেন। এমনকি একই ইউনিয়নে ‘বোয়ালিয়া সদর গোরস্থান’ নামে একটি প্রকল্পে সাড়ে ৩৯ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। অথচ এ নামে সেখানে কোনো গোরস্থান নেই বলে নিশ্চিত করেন ইউপি চেয়ারম্যান। গোপালপুর নতুন ব্রিজের উভয় পাশে মাটি ভরাটের একটি প্রকল্প নিয়ে ৫ গাড়ি মাটি ফেলা হয়েছে।

শামসুর রহমান শরীফ স্বাক্ষরিত দেবোত্তর ইউনিয়নের ৬টি প্রকল্পের একটি তালিকার প্রথমেই রয়েছে কয়রাবাড়ি ঈদগাহ মাঠ উন্নয়নের নামে সাড়ে ৩৯ হাজার টাকা। এ বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা যায়, ঈদগাহ কমিটির কেউই এক টাকাও পাননি। কয়রাবাড়ী বাজারে গিয়ে কথা হয় ঈদগাহ কমিটির সভাপতি শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে যুগান্তরকে তিনি বলেন, ‘ভূমিমন্ত্রীর দেয়া সাড়ে ৩৯ হাজার টাকার মধ্যে ৩৯ পয়সাও পাইনি।’ এ সময় পাশে থাকা ঈদগাহ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. বাকী বিল্লাহ বলেন, ‘মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ঈদগাহ মাঠ সংস্কারের জন্য ৫-১০ টাকা করে চাঁদা তুলেছি। আজকে আপনার কাছেই শুনলাম সাড়ে ৩৯ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না।’

গত অর্থবছরে ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ স্বাক্ষরিত ১৮ লাখ টাকার বিশেষ বরাদ্দের একটি তালিকা পাওয়া যায়। ৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উন্নয়নের নামে এ বরাদ্দ দেয়া হয়। এতে দেখা যায়, আটঘড়িয়ায় মাঝপাড়া ইউনিয়নের তালিকায় লক্ষীপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠ উন্নয়নের নামে ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়ার তথ্য দেয়া আছে।

তবে সরেজমিন এলাকায় গিয়ে এ বিদ্যালয়ের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মাঝপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল গফুর। তিনি ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফের ঘনিষ্ঠ এবং সংশ্লিষ্ট ইউপি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।

একই তালিকায় আটঘড়িয়া পৌর এলাকায় চাঁদভা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ সংস্কারের নামে কাবিখা বরাদ্দ থেকে ৮ টন চাল বরাদ্দ দিতে দেখা যায়। বাস্তবে গিয়ে দেখা যায়, সরকারিভাবে সেখানে বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণ হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের কয়েকজন যুগান্তরকে বলেন, গত দুই বছরে এ স্কুলের মাঠে মাটি ফেলতে দেখা যায়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের কেউই কথা বলতে রাজি হননি।

একই অর্থবছরে টিআর বিশেষ কর্মসূচির আওতায় প্রথম পর্যায়ের তালিকায় দেখা গেছে, বাঁচামরা দুর্গামন্দির উন্নয়নে সাড়ে ৩৯ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। বাস্তবে ওই মন্দিরের সভাপতি কোনো টাকাই পাননি। মন্দিরের সভাপতি নরেশ চন্দ্র দেবনাথ যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি কোনো টাকাই পাইনি। অনেক কষ্ট করে মন্দির পরিচালনা করতে হয়। সরকারিভাবে কোনো সাহায্য পাওয়া যায় না।’

একই তালিকায় চাঁদভা শাহাপাড়া কালীমন্দিরের ঘর উন্নয়নের নামে সাড়ে ৩৯ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে খোঁজ নিয়ে দেখা যায় জরাজীর্ণ অবস্থায় পানির নিচে পড়ে আছে মন্দিরটি। কথা হয় মন্দিরের সভাপতি উত্তমের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘মন্দির ঘর সংস্কারের জন্য ৮ হাজার টাকা পেয়েছি। এর আগে একটন চালের পরিবর্তে ৮ হাজার টাকা পেয়েছিলাম। আর কোনো বরাদ্দ পাইনি।’

আটঘড়িয়া পৌর এলাকার কয়েকটি মসজিদে দেয়া বরাদ্দও বিক্রি করে কিছু কিছু টাকা দিয়েছেন মুকুল। এর মধ্যে খয়রাতি চালের বরাদ্দের তালিকায় দেখা গেছে, বিশ্রামপুর বায়তুন নূর জামে মসজিদে ২ টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

ওই মসজিদ পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি আবদুস সাত্তার যুগান্তরকে বলেন, খয়রাতি চালের ২ টন বিক্রি করে মুকুল আমাকে ২০ হাজার টাকা দিয়েছেন। কেরানির ঢাল জামে মসজিদে ২ টন চাল বরাদ্দ থেকে ২২ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে। চাঁদভা ফোরকানিয়া মাদ্রাসার নামে ২ টন খয়রাতি চাল বরাদ্দ দেখানো হলেও ওই প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব মেলেনি।

পৌরসভার মল্লিকপাড়া আবু বকর (রা.) জামে মসজিদের সভাপতি মো. হাশেম আলী যুগান্তরকে বলেন, ‘কিছুদিন আগে মুকুল এসে তাকে বলেন, ‘ডিসি সাহেবের (পাবনার জেলা প্রশাসক) কাছ থেকে মসজিদের জন্য কিছু চাল কিনে এনেছি। আপনাদের মসজিদের নামেও ১ টন চাল এসেছে। একটি ছবি ও ভোটার আইডি কার্ডের ফটোকপি নিয়ে আসেন ৫ হাজার টাকা দিয়ে দিই। এক টনের দাম ৫ হাজার টাকা শুনে আমি আর ওই টাকা আনিনি।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই মসজিদের জন্য দুই টন খয়রাতি চাল বরাদ্দ হয়, যার পুরোটাই আত্মসাৎ করেন মুকুল। দেবোত্তর ইউনিয়নের গোড়রী হযরত আবু বকর (রা.) হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা পরিচালনা কমিটির সভাপতি ইউনুস আলী যুগান্তরকে বলেন, ‘এ এতিমখানায় শুনেছি ২ টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। অথচ আমি পেয়েছি মাত্র ৬ হাজার টাকা। মুকুল নিজেই এ টাকা দিয়েছেন।’

ইফতারের বরাদ্দও লুটপাট : ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ ২৩ মে মন্ত্রণালয়ের প্যাডে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বরাবর বরাদ্দ চেয়ে একটি দাফতরিক পত্র দেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘ঈশ্বরদী ও আটঘড়িয়া উপজেলার ১২৬টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পবিত্র মাহে রজমানে ইফতার সামগ্রী কিনতে প্রতি প্রতিষ্ঠানের জন্য ২ টন চাল বরাদ্দ প্রয়োজন। এরপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সহকারী সিনিয়র সচিব মো. শাহজাহান পাবনার জেলা প্রশাসককে ভূমিমন্ত্রীর চাহিদার কথা উল্লেখ করে ৫শ’ টন চাল বরাদ্দ দেয়ার তথ্য জানান।

ঈশ্বরদী উপজেলা আওয়ামী লীগের একজন নেতা এ বিষয়ে বলেন, অন্তত একশ’ প্রতিষ্ঠানকে ৫ হাজার টাকার বেশি দেয়া হয়নি। তিনি বলেন, প্রত্যেক মসজিদ ও মাদ াসা পরিচালনা কমিটির সদস্যদের জিজ্ঞাসা করলেই এর প্রমাণ মিলবে।

আটঘড়িয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র রফিকুল ইসলাম রতন বলেন, ‘আমার মনে হয় না- আমি কেন, দুই উপজেলার কোনো আওয়ামী লীগ নেতাই টিআর, কাবিখার তালিকা সম্পর্কে জানেন।’

লুটপাটের বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘বরাদ্দ এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখেন সব জানতে পারবেন। এ নিয়ে ভূমিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কথা বলার ইচ্ছা আমার নেই। তিনি যাই করেন না কেন, তারপরও আমাদের মুরব্বি। উনার ভুলত্রুটি নিয়ে দলীয় সভায় আমিই কথা বলি।’

আটঘড়িয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মাঝপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল গফুর যুগান্তরকে বলেন, ‘মুকুল আর বকুল কিছু দুই নম্বরি করে। এসব করে অন্তত ২০-২৫ বিঘা জমি কিনেছে মুকুল। এছাড়া বাড়িতে দোতলা বিল্ডিংও করেছেন।

চাঁদভা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আশরাফুল আলম বলেন, ‘মুকুলের ভাঙা টিনের ঘর ছিল। এখন সে কোটি কোটি টাকার মালিক। জিআর, টিআর তালিকায় ভুয়া প্রতিষ্ঠানে বরাদ্দ দিয়ে ভূমিমন্ত্রীর সঙ্গে থেকেই বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক তিনি। এটা এলাকার সবাই জানে। সবাই বলবে আটঘড়িয়ায় মুকুল আর ঈশ্বরদীতে বকুল রামরাজত্ব কায়েম করছেন। তারা এখন কোটি কোটি টাকার মালিক।’

তিনি বলেন, ‘তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানের নামে আসা বরাদ্দ তুলে নেয়া হয়েছে, অথচ প্রতিষ্ঠানের কেউ জানে না। এ ধরনের হাজার হাজার অভিযোগ আছে। শুধু তাই নয়, আটঘড়িয়া পিআইও অফিসে প্রতিটি কাজের জন্য ২৫% পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়েছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এক সময় মুকুলের বাড়ি করার জন্য জমিও ছিল না। এখন দোতলা বাড়ি করেছেন, ৪০-৫০ বিঘা জমি কিনেছেন; ব্যাংক ব্যালেন্সও করেছেন।’ ভূমিমন্ত্রীর স্ত্রী কামরুন্নাহার শরীফের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তিনি তো সব খান। উনার খপ্পরে আমিও পড়েছিলাম।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘তিনি (কামরুন্নাহার) বলতেন টাকা দাও মাল (জিআর, টিআর) দিচ্ছি, টাকা দাও চাকরি দিচ্ছি। তার খপ্পরে পরে আমিও ধরা খেয়েছি।’ কত টাকা ধরা খেয়েছেন- জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘২-৩ লাখ টাকা ধরা খেয়েছি। বরাদ্দ এবং চাকরির জন্য এ টাকা দেয়া হয়েছিল।’

অভিযোগের বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম মুকুল বলেন, ‘আমি কোনো অনিয়ম করি না। মন্ত্রী মহোদয়ের কাছ থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নেই। তবে কোনো বরাদ্দ থেকে পার্সেন্টিজ পাই না।’

বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক কিভাবে হলেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি পারিবারিকভাবেই সচ্ছল’। এক পর্যায়ে বলেন, ‘ভাই আমি ঢাকায় এসে দেখা করব। এখন কিছু কইরেন না।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, একবার ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ভূমিমন্ত্রীর স্ত্রীর হাতে দিয়ে ২০ টন বরাদ্দ নিতে হয়েছে। এরপর মাঝে-মধ্যে ফোন দিয়ে বলতেন লোকজন জোগাড় করে চাকরির জন্য টাকা নিয়ে আস, চাকরি দিয়ে দিই।

ইউপি চেয়ারম্যান আরও জানান, একবার মুকুল আর তার দ্বিতীয় স্ত্রী নিলার মাধ্যমে আটঘড়িয়ায় একজনকে পুলিশে চাকরি দেয়। কিন্তু চাকরি দেয়ার বিনিময়ে বাড়িঘর সব দলিল করে লিখে নেয়। বিষয়টি ফাঁস হয়ে গেলে একজন সিনিয়র মন্ত্রীর চাপে তা ফেরত দিতে বাধ্য হয়।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ভূমিমন্ত্রী সবই জানেন। দলীয় সভায় মুকুল, বকুল ও নিলার বিরুদ্ধে কথা বলা হয়। কিন্তু তিনি কোনো পদক্ষেপ নেন না। বরং তাদের সম্পর্ক আরও পাকাপোক্ত হয়। এতেই তো সব বোঝা যায়।’- যুগান্তর

শর্টলিংকঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *