দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী তৃষ্ণার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জয়ের গল্প

(ইউএনবি) দুই চোখে আলো নেই। নিভে গেছে এসএসসি পরীক্ষার আগেই। কিন্তু তাতে দমেননি হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান সাদিয়া আফরিন তৃষ্ণা। অদম্য ইচ্ছাশক্তি দাবিয়ে রাখতে পারেনি তার প্রখর প্রতিভাকে। দৃষ্টিহীন অবস্থায় এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তৃষ্ণা এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইসলামের ইতিহাস বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী।

ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার ব্রাহিমপুর গ্রামের নাইট গার্ড হতদরিদ্র মিজানুর রহমানের প্রথম সন্তান তৃষ্ণা। বাবা শৈলকূপার গাড়াগঞ্জ বাজারের হান্নান ফিলিং স্টেশনে পাঁচ হাজার টাকায় নৈশ প্রহরীর চাকরি করেন। এই টাকায় তার সংসারই চলে না। তারপরও মেয়েকে পড়াচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। হতদরিদ্র নাইট গার্ড বাবার স্বপ্ন মেয়ে পড়ালেখা করে শিক্ষক হবে।

এদিকে একে তো দৃষ্টিহীন তার ওপর দরিদ্র তৃষ্ণার ঢাবি জয়ের গল্প এলাকায় অনেকটা রূপকথার মতোই মনে হচ্ছে সাধারণের মাঝে।

এলাকাবাসীর মতে, তৃষ্ণার সাধনা ওই এলাকার জন্য উদাহরণ। দরিদ্র্যতা এবং দৃষ্টিহীন হয়েও সে যেভাবে সংগ্রাম করছে, সে সংগ্রামের পথ ধরে উচ্চ শিক্ষার জন্য দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন এবং সেখানে পড়ালেখা করছে, তা ওই এলাকার নতুন প্রজন্ম বা সংগ্রামী মানুষের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

তৃষ্ণার বাবা মিজানুর রহমান জানান, ২০০৭ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার আগেই চোখে ঝাপসা দেখা শুরু করে তার মেয়ে। রংপুর, সিরাজগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও সর্বশেষ ঢাকা ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়েও ধরে রাখা যায়নি তৃষ্ণার চোখের আলো। ওই বছরের শেষের দিকে তার দুই চোখের আলো নিভে যায়।

দৃষ্টি হারানোর পর কখনো মেয়ের একা একা পড়ার সক্ষমতা ছিল না। কিন্তু একটুও মনোবল হারাননি তৃষ্ণা। এই অবস্থায় তাকে ভর্তি করা হয় ঢাকা ব্যাপটিস্ট চার্চ মিশনারিজ স্কুলে। কৃতিত্বের সঙ্গে অষ্টম শ্রেণি পাস করার পর তাকে ভর্তি করা হয় ঢাকা আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে। ২০১৫ সালে এসএসসি পাস করার পর ভর্তি হন বেগম বদরুন্নেছা মহিলা কলেজে। সেখান থেকে পাস করে ঢাবিতে ভর্তি হন বলে জানান মিজানুর রহমান।

তৃষ্ণা জানান, শিক্ষকদের লেকচার রেকর্ড করে তাকে পড়তে হয়েছে। এখন লেখাপড়া ভালোভাবে চালিয়ে নেওয়ার জন্য একটি ল্যাপটপ দরকার, কিন্তু সে সামর্থ্য নেই তার।

ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সমাজের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের শিক্ষার দায়িত্ব নিতে চান তৃষ্ণা। লেখাপড়া শেষ করে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে একজন ভালো শিক্ষক হতে চান তিনি।

তৃষ্ণার পিতা মিজানুর রহমান বলেন, ‘নিজের দুই বিঘা জমি বিক্রি করে মেয়ের চিকিৎসা করিয়েছি। কিন্তু চোখ ভালো হয়নি। এখন অনেক কষ্টে লেখাপড়ার খরচ চালাচ্ছি। সমাজের বিত্তবানরা যদি তার লেখাপড়ার দায়িত্ব নিত তাহলে তার স্বপ্নপূরণ হতো।’

এ বিষয়ে ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক সরোজ কুমার নাথ জানান, মেধাবী তৃষ্ণার লেখাপড়ার জন্য জেলা প্রশাসন সব ধরনের সহযোগিতা করবে। তৃষ্ণা লেখাপড়া শেষ করে একজন স্বাবলম্বী ও ভালো মানুষ হয়ে দেশের কল্যাণে কাজ করতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

শর্টলিংকঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *