দুর্লভ গাছ হুলাবনকিকার

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার মলাজানি গ্রাম! গারো ক্ষুদ্র জাতিসত্তার এক বাড়ির সীমানায় ঘন সবুজ ঝোপের দিকে চোখ পড়ল। মুকুট উঁচিয়ে এক থোপা সাদা ফুলের মঞ্জরি দেখে গাছটি চেনার চেষ্টা করলাম। কিন্তু প্রথম দর্শনেই অচেনা মনে হলো। বাড়ির কর্তা নিকুঞ্জ ম্রোংকে জিজ্ঞেস করেও এ গাছের কোনো নাম পেলাম না। তবে তিনি জানালেন, বছর সাতেক আগে ওয়ার্ল্ড ভিশনের এক কর্মকর্তা জাপান থেকে তাঁকে এ গাছের চারা এনে দিয়েছিলেন। আর বলেছিলেন, এ গাছের পাতা প্রস্রাবের যত অসুখ আছে তা ভালো করবে। এমন দরকারি একটা গাছ উপহার পেয়ে তিনি তাঁর বাড়ির আঙিনাতেই গাছটি লাগিয়ে যত্ন শুরু করেন। দেখতে দেখতে গাছ বড় হয়ে বেশ খানিকটা জায়গা ঝোপ করে ফেলে। তলপেটে ব্যথা বা প্রস্রাবের জ্বালাযন্ত্রণা হলে নিকুঞ্জ ম্রোং সেই গাছের পাতা তুলে জলে সেদ্ধ করে ছেঁকে সেই জলটা খান। তাতে সমস্যা দূর হয়। ওই গাছের বিদ্যা তাঁর এ পর্যন্তই জানা। বললেন, গ্রামে শুধু তাঁর বাড়িতেই গাছটি আছে। তিনি আর কোথাও এ গাছ দেখেননি। সত্যি বলতে কি, আমিও দেখিনি।
ঢাকায় ফিরে গাছটির তত্ত্বতালাশ শুরু করি। প্রকৃতিপ্রেমী ফারুক আহমেদ আমাকে গাছটির কিছু পরিচয়ের সূত্র ধরিয়ে দিলেন। সেই সুবাদে জানা হলো গাছটির আসল পরিচয়। সারা বিশ্বে এটি যে এত দরকারি একটা গাছ, তা জানা ছিল না। নিকুঞ্জ ম্রোংয়ের কথাই সত্যি। প্রস্রাবের অসুখটা হয় কিডনির সমস্যা থেকে। এ গাছ সেই সমস্যা দূর করতে পারে বলেই তার ইংরেজি নাম কিডনি টি প্ল্যান্ট, অন্য নাম জাভা টি ও ক্যাটস হুইসকারস। হুলো বিড়ালের গোঁফ বা মোচের মতো এ ফুলের লম্বা সরু পুরুষ কেশরগুলো। সে জন্য কিনা জানি না, এ গাছের বাংলা নাম করা হয়েছে হুলাবনকিকার। বিড়ালমোচী নামও রাখা যেত।
এ গাছের আদি নিবাস আফ্রিকা, দ‌ক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঔষধি গাছ। তবে কেউ কেউ শখ করে ফুলগাছ হিসেবে এ গাছ লাগায়। এ দেশে দুর্লভ, সচরাচর চোখে পড়ে না। তবে এ দেশের উদ্ভিদসম্পদের তালিকায় গাছটির অস্তিত্ব আছে। তার মানে দেশের কোথাও না কোথাও এ গাছ রয়েছে। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া এ গাছের বাণিজ্যিক উৎপাদক। ইন্দোনেশিয়া এ গাছ থেকে তৈরি বিভিন্ন ওষুধ ও পানীয় সামগ্রী উৎপাদন করে বিভিন্ন দেশে তা রপ্তানি করে। বিশেষ করে এ গাছের পাতা থেকে বানানো একধরনের চা সারা বিশ্বে ‘জাভা টি’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। যার ঔষধি গুণ অনন্য।
হুলাবনকিকার গাছের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম অর্থোসিফন অ্যারিস্ট্যাটাস, পরিবার ল্যাবিয়েটা অর ল্যামিয়াসি। এ গাছের বৈজ্ঞানিক নাম orthosiphon এসেছে ঊর্ধ্বমুখী নলাকার ফুলের গড়নের জন্য, আর অ্যারিস্ট্যাটাস অর্থ শিষ। ফুলের রং সাদা ও আকৃতি নলাকার। পাপড়ির চেয়ে পুরুষ কেশরগুলো অনেক লম্বা ও রশ্মির মতো ছড়ানো। গ্রীষ্মকালে ফুল ফোটে। ফুল থেকে ফল হয়। ডাল কেটে লাগালে চারা হয়। এ গাছের শুধু পাতা ভক্ষণযোগ্য, গাছের অন্যান্য অংশ বিষাক্ত। এ গাছ রোদেলা জায়গায় ভালো বাড়ে। তবে কিছুটা ছায়া জায়গাতেও চাষ করা যায়।
শুধু কাঁচা পাতাই নয়, এর শুষ্ক পাতারও ঔষধি গুণ রয়েছে। এর পাতা থেকে তৈরি বিভিন্ন বড়ি বা ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, চা ইত্যাদি বিদেশের বাজারে বিক্রি হয়, যার ঔষধি মূল্য রয়েছে। শ্বাসজনিত সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, গেঁটেবাত, স্নায়ুরোগ, দাঁতের সমস্যা, চর্মরোগ, ওজন হ্রাস সমস্যা ইত্যাদিতে এ গাছ কার্যকর।

শর্টলিংকঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *