তুমি আর নেই সে তুমি

মন সে তো জলের মতো। এই টলটলে। এই ঢেউয়ের দোলা। পরক্ষণেই শান্ত। থম মেরে থাকা। অতল জলের থই মেলে না। নিজের মনের থই-ই কি আর সব সময় খুঁজে পাওয়া যায়? অন্যের মন তো আরও গভীর জল। তার তল খুঁজে পাওয়া যে আরও কঠিন।

মনের এই টানাপোড়েনে সবচেয়ে বেশি নাকাল হয় কারা? যাদের সম্পর্কই মনের। যেখানে সম্পর্কের ভিত্তি রক্তের নয়, আত্মার। আমরা ডাকি জীবনসঙ্গী। সঙ্গী বা সঙ্গিনীর মনের গহিনে কী আছে? জানতে, বুঝতে কেটে যায় অনেকটা সময়। সঙ্গী কখনো খুব চেনা। হাতের পাতার মতো চেনা। কখনো খুব দূরের।

দাম্পত্য জীবনে আবেগ আর অনুভূতির দোলাচলে কত প্রশ্ন ভিড় করে মনে। সঙ্গী বা সঙ্গিনীর ভাব প্রকাশের একটু বদলেই মনে জাগে প্রশ্ন। কেন এমন হলো? ও কি বদলে যাচ্ছে? দূরে সরে যাচ্ছে? কখনো এসবের উত্তর মেলে, কখনো মেলে না।

এমন সময় কম-বেশি সবার জীবনেই আসে। আবার কেটেও যায়। তবে ঘটনার ছবিগুলো আলাদা আলাদা হয়। চলুন তবে জোড়া দিই তিনটি জীবনের ছবি।

১.
বেসরকারি ব্যাংকে দায়িত্বশীল পদে রয়েছেন মিনহাজ কবির আর নাবিলা ইসলাম (ছদ্মনাম)। দুজনেই ৩৫ বছরের কোঠায়। কাজের চাপটা দুজনেরই বেশি। ছোট্ট এক ছেলে আর মেয়েকে নিয়ে হিমশিম দশা। দুজনেই ভাগাভাগি করে সামলে নেন চাপগুলো। অফিস থেকে ফিরে নাবিলা যখন ছোট ছেলেকে সামলান, মিনহাজ তখন মেয়েকে পড়ান। এর ফাঁকে ফাঁকে চলে টুকটাক গল্প। তবে গেল কয়েক দিন দৃশ্যটা একটু আলাদা। নাবিলা একাই সবকিছু সামলাচ্ছেন। মিনহাজের কেমন যেন আলাদা ব্যস্ততা। নাবিলা লক্ষ করছেন, ইদানীং মিনহাজের বাড়ি ফিরতে অনেক রাত হয়। আর নাকেমুখে গুঁজে খেয়েই বসে পড়ে স্মার্টফোন নিয়ে। কী এত দেখে মিনহাজ? বেশ কটা দিন গেল। এবার স্মার্টফোনই চক্ষুশূল হয়ে উঠেছে নাবিলার। কেমন যেন একটা সন্দেহ পেয়ে বসে! তবে কী ওর জীবনে অন্য কেউ ঢুকে পড়ল? ফেলে আসা কোনো অতীত নয় তো? হতেও তো পারে পছন্দের কাউকেই সে ফলো করে ফেসবুকে?

নাবিলা যথেষ্ট বাস্তববাদী। সরাসরি মিনহাজকে জিজ্ঞেস করে। কিন্তু মিনহাজ কোনো সদুত্তর দেয় না। মজার ছলে উড়িয়ে দিতে চান নাবিলার মনের মেঘকে। কিন্তু মেঘ কাটে না। নাবিলার মনের আকাশে জমতে থাকে। ভাগ্যিস ঝড়টা ওঠার আগেই মিনহাজ বুঝিয়ে বলেছিলেন নাবিলাকে। জানিয়েছিলেন, অফিসে নতুন কিছু দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই তাঁর এত দেরি। আর বাসায় ফেরার পরও ফেসবুকে সহকর্মীদের সঙ্গে সেগুলো নিয়ে আলোচনা চলে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন নাবিলা।

২.
নিজের মনের কথা খুব বেশি খুলে বলতে পারেন না ৩০ বছরের স্বাতী (ছদ্মনাম)। এখনো পড়াশোনা করছেন তিনি। স্বামী শাহীন ইসলাম (ছদ্মনাম) প্রশাসনিক কর্মকর্তা। পারিবারিকভাবে বিয়ে দুজনের। বিয়ের পর দিনগুলো ভালোই কেটেছিল। খুব বেশি রোমান্টিকতা নেই শাহীনের মধ্যে। তবে তাঁরা দুজনে ঘুরে বেড়াতেন। শাহীন এটা-সেটা উপহার দিতেন। মাঝে মাঝে কবিতাও পড়ে শোনাতেন। স্বাতীর মনে হতো জীবনটা মন্দ নয়। কিন্তু ঠিক কবে থেকে যেন সুর কেটে গেল। দুজনের দূরত্ব বাড়ল। পাশাপাশি থেকেও হাত বাড়িয়ে একে অন্যকে ছোঁয়াটা বড় কঠিন হয়ে গেল। স্বাতীর বক্তব্য, না বললে শাহীন আজকাল কোথাও বেড়াতে যেতে চান না। বলার পর যান। কিন্তু কেউ কোনো কথা খুঁজে পান না। সবটাই যেন দায়িত্বপালন। উপহারের বদলে আজকাল টাকা দেন শাহীন। অভিমানী স্বাতীও আর বলেন না কিছুই। তাতেও যেন শাহীনের কিছুই যায়-আসে না। একসময় এমন জীবনেই নিজেকে মানিয়ে নেন স্বাতী। দায়িত্বশীল শাহীনকেই নিজের উপযোগী বলে ভাবার চেষ্টা করেন। শুধু মনের ইচ্ছেগুলো আর ডানা মেলে না।

৩.
৪০ বছর পার হওয়া ফরহাদ কবিরের (ছদ্মনাম) নিজের একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। স্ত্রীর সঙ্গে বয়সের ব্যবধান বছর ছয়েকের। বিয়েটা অবশ্য একটু দেরিতেই করেছেন। তবে স্ত্রীর কিছু আচরণে মাঝে মাঝে নিজেকে বড্ড অবহেলিত মনে হয়। কিছুটা বিরক্তও লাগে।

ফরহাদ দারুণ আড্ডাবাজ। আত্মীয়স্বজনের চেয়ে বন্ধুর বাড়িতে যেতে বেশি পছন্দ করেন। স্ত্রী ছন্দা (ছদ্মনাম) প্রায়ই তাঁর মা-চাচি-খালার বাড়ি যান। ফরহাদ বোঝেন, হয়তো আত্মীয়দের চাপে পড়ে বা অনুরোধ রাখতেই এত ঘনঘন যাওয়া। তাতে আপত্তি নেই ফরহাদের। কিন্তু খারাপ লাগে যখন দেখেন, দিনের পর দিন তিনি ছন্দাকে বন্ধুদের বাসায় যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন আর ছন্দা নানা কারণ দেখিয়ে এড়িয়ে যান। তবে কী ছন্দা তাঁকে ভালোবাসে না? তাঁর অনুরোধ, আবেগ এগুলো কি ছন্দার কাছে মূল্যহীন? আবেগপ্রবণ ফরহাদ নিজের এসব মন খারাপ খুলে বলতে পারেন না। দুঃখটা রাগ হয়ে যায়। ছন্দার ওপর রাগারাগি করেন। ছন্দাও মন খারাপ করেন। ভাবেন, তাঁর আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়া কেন ফরহাদের এত অপছন্দ? দুজনেই ভুল বোঝেন দুজনকে।

আসলে মানুষের মন কি কখনো এক রকম থাকে? সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদল আসে। পরিস্থিতি অনুসারে বদলে যায় মানুষের আবেগ, অনুভূতি। ভালোবাসার প্রকাশটাও বদলায়। দাম্পত্য জীবনে কেবল নয়। সব সম্পর্কের ধরনই সময়ের সঙ্গে বদলায়। দাম্পত্যে আবেগ বেশি থাকে। অধিকারবোধও বেশি। তাই হয়তো টানাপোড়েনও বেশি চলে। আবেগের সঙ্গে সব সময় পেরে ওঠা যায় না। তবু যুক্তি দিয়ে বিষয়গুলো ভাবলে হয়তো কিছুটা স্বস্তি মেলে। সঙ্গীর বদলে যাওয়া আচরণের কারণটা খুঁজে বের করাও সহজ হয়।

মন নিয়ে যাঁদের কাজ, তাঁদের কাছেই শুনি বিষয়টা। ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তানজির আহম্মদ বলেন, ‘দাম্পত্য জীবনে শেয়ারিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনুভূতিগুলো পরস্পরের কাছে প্রকাশ করলে সম্পর্ক সহজ থাকে। সঙ্গী বা সঙ্গিনীর আচরণে বদল দেখলে প্রথমেই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া ঠিক নয়। প্রথমে সঙ্গী কেন এমন করছে, তা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। তাকে সময় দিতে হবে। সন্দেহ মনে আসতে পারে, তবে সেটা ঝেড়ে ফেলাই ভালো।’ অনুভূতি প্রকাশে হেরফের হওয়ার পেছনে আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। শেয়ার করার বিষয়টিও পরস্পরের আচরণের ওপর নির্ভর করে। অনেকে শেয়ার করার জন্য জোর করেন। অনেকে আবার কোনো কিছু শেয়ার করার পরই সঙ্গীর সামনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখান। রেগে যান, দুঃখ পান। চেষ্টা করা উচিত সঙ্গীর মনোভাব বোঝার। ভাবা দরকার তার জায়গায় আমি থাকলে কী করতাম।

দাম্পত্য জীবনে সব সময় সবকিছু শেয়ার করা সম্ভব না-ও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে অন্তত আভাসটা দেওয়া দরকার। কেউ যদি নিজের পারিবারিক কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তায় থাকেন, সেটুকু অন্তত সঙ্গীকে বলা দরকার। তাতে ভুল বোঝার সুযোগ থাকে না।

আসলে প্রত্যেক মানুষেরই একান্ত ব্যক্তিগত কিছু বিষয় থাকে। জীবনসঙ্গীর সেই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে মূল্যায়ন করাটা জরুরি। অনুভূতি বা আচরণ সব সময় এক রেখায় থাকে না। সবই জীবনের অংশ।

শর্টলিংকঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *