জাতীয় নির্বাচনে আ’লীগের মনোনয়ন গোপনে ‘সবুজ সংকেত’

হাইকমান্ডের সংকেত পেয়েই ১০০ প্রার্থী মাঠে, বাকিদের সেপ্টেম্বরে * মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ মুহূর্তে আনুষ্ঠানিক নাম ঘোষণা

জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য দলীয় কোন্দল, ভোটের আগে দলবদল ও বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এরই অংশ হিসেবে সারা দেশের মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতাদের ঐক্যবদ্ধ করার পাশাপাশি বেশকিছু নেতাকে অতি গোপনে ‘সবুজ সংকেত’ দিয়েছে দলটির হাইকমান্ড।

সারা দেশে নির্বাচনী সফরে থাকা আওয়ামী লীগের ১৫টি টিমের প্রতিবেদন, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদন এবং দলীয় সভাপতির পর্যবেক্ষণের আলোকে এসব নেতাকে সবুজ সংকেত দেয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত একশটি আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের এ সংকেত দেয়া হয়েছে।

তবে এ বিষয়টি গোপন রাখতে সংশ্লিষ্টদের দেয়া হয়েছে কঠোর নির্দেশ। এমনকি নিজ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও এ ব্যাপারে কোনো ধরনের আলোচনা না করতে বলা হয়েছে। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।

আরও জানা যায়, ‘সবুজ সংকেত’ পাওয়া নেতারা এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ করছেন। মনোনয়নপ্রত্যাশী অন্যদের সঙ্গে মিলেমিশে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রচার ও নৌকার পক্ষে ভোট প্রার্থনা করছেন। যাকেই নৌকার মনোনয়ন দেয়া হোক না কেন, তার হয়েই কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। মনোনয়নপ্রত্যাশী অন্য নেতাদের কাছ থেকেও একই ধরনের প্রতিশ্রুতি আদায় করছেন তারা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ বুধবার যুগান্তরকে বলেন, বিভিন্ন সংস্থা এবং দলের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রার্থীদের মনোনয়ন চূড়ান্ত করছেন। যেসব আসনে যাদের মনোনয়ন দিলে জয় নিশ্চিত হবে, এমন নেতাদের মনোনয়নের জন্য ‘সবুজ সংকেত’ দেয়া হচ্ছে। এ সংখ্যা এখন পর্যন্ত একশ। বাকি আসন নিয়ে কাজ শেষ পর্যায়ে। নির্বাচনের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এভাবে সবুজ সংকেত যাবে।

তিনি বলেন, একটি আসনে কমপক্ষে ৪-৫ জন করে নেতা দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী। সম্ভবত সে কারণেই তা প্রকাশ করছেন না নেতারা। এবারের মনোনয়ন বাছাইয়ে বিতর্কিত, দলের ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণকারী এমপিরা মনোনয়ন পাচ্ছেন না বলেও জানান তিনি।

প্রার্থী নন, নৌকা মার্কা দেখে ভোট ও ভোটের প্রচার করতে দলীয় নেতাকর্মীদের এরই মধ্যে নির্দেশ দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২৩ জুন গণভবনে এক বিশেষ বর্ধিত সভায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের এ নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেছেন, কে প্রার্থী আর কে প্রার্থী না, সেটা না দেখে নৌকা মার্কায় ভোট চাওয়ার জন্য জনগণের কাছে যেতে হবে।

যাকে আমরা নৌকা মার্কা দেবে, যাকে আমরা নির্বাচনে প্রার্থী করব, তার পক্ষে সবাইকে কাজ করতে হবে। আওয়ামী লীগ সভাপতি আরও বলেন, এত উন্নয়ন করার ফলে মানুষ যে নৌকায় ভোট দেবে না, তা কিন্তু নয়। যদি না দেয়; তার জন্য দায়ী থাকবেন আপনারা তৃণমূল; এটাই আমার কথা।

আপনারা সঠিকভাবে মানুষের কাছে যেতে পারেননি, বলতে পারেননি, বোঝাতে পারেননি, সেবা করতে পারেননি; সেজন্যই। নইলে এখানে হারার তো কোনো কথা না। নির্বাচনে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি পরিহার করার তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা বদনাম নিতে চাই না, জনগণের মন জয় করেই ক্ষমতায় আসতে হবে।

মনোনয়ন চূড়ান্ত বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক যুগান্তরকে বলেন, দলীয় মনোনয়নের জন্য আবেদন চাওয়া শুরু হয়েছে। কিছু কিছু আসনে যেসব নেতার অবস্থা ভালো, তাদের দলীয় সভানেত্রী (শেখ হাসিনা) ডেকে এলাকায় কাজ করতে বলেছেন। তারা কাজ করছেন। কেন্দ্রীয়ভাবেও কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে এসব দেখভালের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সেপ্টম্বরের শেষনাগাদ তিনশ’ আসনের মনোনীত প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শেষ হবে।

‘সবুজ সংকেত’ পাওয়া নেতাদের নাম সুনির্দিষ্টভাবে পাওয়া না গেলেও আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেট বিভাগের কমপক্ষে একশটি আসনে এলাকার জনপ্রিয় নেতা নির্বাচনী প্রচারণার নির্দেশ পেয়েছেন। তারা প্রকাশ্যে মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। কেন্দ্র থেকেও তাদের মনিটরিং করা হচ্ছে।

জানা যায়, ২০১৪ সালের নির্বাচনের প্রার্থীর নাম ঘোষণার সময় কম ঝামেলা পোহাতে হয়নি কেন্দ্রীয় নেতাদের। সেসময় ধানমণ্ডির আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে তখনকার সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের সামনেই মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের সমর্থকরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনাও ঘটে।

এখানেই শেষ নয়, মনোনয়নবঞ্চিত নেতারা নিজ নির্বাচনী এলাকায় হরতাল, টায়ার জ্বালিয়ে রাস্তা অবরোধ, প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ নেতার বাড়ি ভাংচুরের মতো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটায়। এসব মাথায় রেখে এবার দলীয় মনোনয়ন নিয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে আওয়ামী লীগ।

নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একজন প্রভাবশালী নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনের প্রার্থী চূড়ান্তের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে এবার মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময়ের ঠিক দু’দিন আগে দলীয় মনোনীত নেতাদের তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।

তিনি আরও বলেন, দল একটানা সাড়ে নয় বছর ক্ষমতায় থাকায় নেতাকর্মীদের মধ্যে সক্ষমতা ও প্রভাব বেড়েছে। প্রায় প্রতিটি আসনে এমন প্রভাবশালী কমপক্ষে ৪ জন করে নেতা আছেন, যারা দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা করেন। এ মুহূর্তে কাউকে প্রকাশ্যে ‘সবুজ সংকেত’ দিলে এলাকা উত্তপ্ত হয়ে উঠবে। সংঘাত সৃষ্টি হবে। মারামারি এমনকি খুনাখুনির ঘটনাও ঘটতে পারে। এতে দলের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার পাশাপাশি বিদ্রোহী প্রার্থী ও নেতাদের দলবদলের আশঙ্কা থাকছে।

আওয়ামী লীগ সূত্রে আরও জানা যায়, এবারের নির্বাচনে বেশ কিছু বিভিন্ন পেশার ‘সেলিব্রেটিকে (তারকা)’ মনোনয়ন দেয়া হবে। ‘সবুজ সংকেত’প্রাপ্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এমন তারকা প্রার্থী আছেন। এ সংখ্যা কমপক্ষে ১৫ জন। সবুজ সংকেত পাওয়া এসব সেলিব্রেটির মধ্যে আইনজীবী, ক্রিকেটার, অভিনয়শিল্পী, সাবেক আমলা আছেন। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের নির্বাচনে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য, জনপ্রিয় ও অরাজনৈতিক এসব নেতাকে নৌকার ভার তুলে দেয়া হচ্ছে বলেও সূত্রটি জানায়।

নির্বাচনী জোট সম্প্রসারণ কাজে সম্পৃক্ত আওয়ামী লীগের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, ১৪ দলীয় জোটের পরিধি বাড়বে। মহাজোটও হতে পারে। বিএনপি নির্বাচনে এলে সে হিসাবে কিছু আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করতে হবে। তবে এখন পর্যন্ত জোটের শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কয়েকজনকে নির্বাচনের জন্য ‘সবুজ সংকেত’ দেয়া হয়েছে।

ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে জমা পড়া বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্টে বিতর্কিত এমপিদের আমলনামা এবং মনোনয়নপ্রত্যাশী ‘সবুজ সংকেত’ পাওয়া নেতাদের ভালো-মন্দ ঠাঁই পেয়েছে। বেরিয়ে এসেছে এমপি না হয়েও এরই মধ্যে নির্বাচনী এলাকায় জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন যারা। আছে কাদের জয়ের সম্ভাবনা।

তালিকার একটি অংশজুড়ে আছে নেতিবাচক ইমেজে আচ্ছাদিত বেশ কিছুসংখ্যক এমপির হালচাল। কারা একেবারে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন, সিন্ডিকেট আর স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নিয়ে কারা ব্যক্তিস্বার্থে জনস্বার্থ লঙ্ঘন করেছেন, নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য এমপি-মন্ত্রী হয়েও মাঠপর্যায়ে অনেকটা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন- এমন ব্যক্তিদের নামও আছে এ তালিকায়। জানা গেছে, এরকম বিপৎসংকুল আসনগুলোয় নতুন মুখ তালাশ করা হচ্ছে।

এছাড়া ক্ষমতার অপব্যবহার করে ক্যাডার বাহিনী গড়ে তুলে যারা জমি দখল, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, দখলবাজি, নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য, টিআর-কাবিখা প্র্রকল্প লুটপাট, টেন্ডারবাজি, কমিশন বাণিজ্য ছাড়াও সব মিলিয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন, তাদের এক রকম কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। আর এসব আসনেই দীর্ঘদিন থেকে কাজ করে আসা ত্যাগী নেতাদের ‘সবুজ সংকেত’ দিচ্ছে আওয়ামী লীগ।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ২৬ জানুয়ারি থেকে তৃণমূল গোছাতে কাজ করছে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ১৫টি টিম। এরই মধ্যে অধিকাংশ জেলা সফর করেছে টিমগুলো। দলীয় সভাপতির নির্দেশে দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদকরা যাচ্ছেন বিতর্কিত নেতাদের দোরগোড়ায়। সবাইকে নিয়ে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে করছেন উঠোন বৈঠক। বিরোধ নিরসনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ করতে নৌকার গণসংযোগের নির্দেশ দিচ্ছেন। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে করছেন সদস্য সংগ্রহ অভিযান।

টিমগুলোর দায়িত্বে থাকা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তৃণমূলে বিরোধ থাকলেও তা নিরসন করা সম্ভব হচ্ছে। দলীয় মনোনয়ন নিয়ে অধিকাংশ আসনে ঝামেলা আছে। একাধিক প্রার্থী গণসংযোগ করছেন। সে বিষয়টিও তারা পর্যবেক্ষণ করছে। সেখান থেকে সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম কেন্দ্রে সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশকৃত সেসব প্রার্থীর মধ্য থেকে অনেককে ‘সবুজ সংকেত’ দেয়া হচ্ছে।

শর্টলিংকঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *