এক সন্তানেই থেমে থাকা

‘ওহ! একটাই! আর নেননি কেন?’
‘আর ঝামেলা পোহাতে চাননি বুঝি!’
‘ও একা কীভাবে থাকে?’
‘একা যখন, তখন নিশ্চয় অনেক জেদি, স্বার্থপর!’

এক সন্তানের মা-বাবাকে জীবনে কতবার যে এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, তার ইয়ত্তা নেই। উত্তর দিতে দিতে কখনো কখনো তাঁরা হাঁপিয়ে ওঠেন। কারও কারও বছরের পর বছর একই উত্তর দিতে দিতে অভ্যাস হয়ে যায়। প্রশ্নের মুখে পড়লে উত্তরটা শুধু ভাঙা রেকর্ডের মতো বাজিয়ে চলেন।

অনেকে প্রশ্নের পর নিজের মতামতও দিয়ে দেন, ‘ভাইবোন না থাকলে মা-বাবার আহ্লাদে-আশকারায় মাথায় ওঠে, কারও সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারে না।’ এক সন্তান নিয়ে এমন মিথ শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়েই রয়েছে। ১০০ বছর আগে শিশু মনোবিজ্ঞানী গ্র্যানভিল স্ট্যানলি হোল বলেছিলেন, ‘এক সন্তান নেওয়া একধরনের অসুস্থতা।’ এই মিথের পক্ষে তাঁর এই মতামত ইন্ধন জোগায় তো বটেই, তবে এক সন্তানের মা-বাবারা স্বস্তি পেতে পারেন এই ভেবে যে, যুগের সঙ্গে মনোবিজ্ঞানীদের এমন ধারণা পাল্টেছে। এক সন্তান বিষয়ে সামাজিক কিছু সমস্যার কথা জানালেও আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে একজন মানুষের জীবনযাপনে নিজস্ব পরিকল্পনা ও স্বাতন্ত্র্যকে তাঁরা গুরুত্ব দিচ্ছেন।

বাংলাদেশের মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এক সন্তানে থেমে যাওয়ার ব্যাপারে প্রত্যেকের গল্প ভিন্ন। বাংলাদেশে কর্মজীবী ও শহুরে দম্পতিদের মধ্যে এক সন্তানের আধিক্য বেশি। তাঁদের মধ্যে কারও কারও বাড়িতে সন্তান দেখভালের লোক না থাকায় একজনের বেশি তাঁরা নিতে চান না। সন্তান পালনে আর্থিক বিষয়টি জড়িত থাকায় অনেকে এক সন্তানের পেছনে বেশি ব্যয় করে সন্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে মনোযোগ দেন। অনেকে প্রথম সন্তান জন্ম দেওয়ার সময়ের অসুস্থতা কাটিয়ে উঠতে না পেরে দ্বিতীয় সন্তানের ব্যাপারে আগ্রহ পান না। আবার অনেকের প্রাকৃতিকভাবেই এক সন্তানের বেশি হয় না। অনেকে বিয়ের স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয়ে ভোগা থেকে সন্তানের সংখ্যা বাড়াতে চান না। আবার সবকিছু অনুকূলে থাকলেও অনেকে জীবনযাপনে নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতে একটি সন্তানেই সন্তুষ্ট থাকেন।

এক সন্তানের মায়েরা
‘আমার ভাইবোন নেই কেন?’ ১৬ বছর বয়সী মেয়ের কাছ থেকে এমন প্রশ্ন হাজার বার শুনতে হয় মা রওনক জাহানকে। তিনি জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের উপপরিচালক (দৃশ্যসজ্জা, রেখায়ন)। স্বামী মোমিনুল আবেদিন ব্যাংক কর্মকর্তা। একমাত্র সন্তান মিদৌরী ফাইজাহ্ আবেদিন মাস্টারমাইন্ড স্কুলে দশম শ্রেণিতে পড়ে।

প্রথম আলোকে রওনক জাহান বলেন, ‘যাঁকে পছন্দ করেছি, তাঁকে বিয়ে করেছি। যেভাবে পেশাজীবন চেয়েছি, তা-ই হয়েছে। মা হতে চেয়েছি, হয়েছি। কিন্তু মেয়ের প্রশ্ন শুনে এখন মনে হয়, এক সন্তান নেওয়াটা আমার ভুল সিদ্ধান্ত। আমি আমার কথাই ভেবেছি। মাতৃত্বের স্বাদ পেয়েছি। সন্তানের যে ভাইবোন দরকার, তা বুঝিনি। আমরা আট ভাইবোন ছিলাম। সুখে-দুঃখে এখনো ভাইবোনেরা একে অন্যের কাঁধে হাত রাখি। আমার সন্তান তো সেই সুযোগ পাবে না।’

যৌথ পরিবারে থাকায় সন্তান পালনে রওনক জাহানকে কখনো কোনো ঝক্কি পোহাতে হয়নি। অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পর মেয়ে যখন জড়িয়ে ধরে বলে, ‘আম্মু, আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখো, আমার দিকে তাকিয়ে থাকো, আমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হাসো’; তখন আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। তবে প্রায়ই ভাবেন, তিনি না থাকলে মেয়েটি একা কীভাবে বড় হবে?

রওনক জাহানের মতে, সন্তান একা মানেই স্বার্থপর হবে, এটা একেবারেই ভুল ধারণা। এখানে পরিবেশ মূল কথা। তিনি নিজে সন্তানকে ভাগাভাগি (শেয়ার করা) শিখিয়েছেন এবং সন্তানও সেটা খুব ভালোভাবে ধারণ করেছে বলে তাঁর বিশ্বাস।

একা হওয়ায় মেয়ে মিদৌরী নিজে দায়িত্বের চাপ বোধ করে। সে বলে, ‘সব সময় মনে হয়, আমার ভাইবোন না থাকায় আমার কাছে আব্বু-আম্মুর প্রত্যাশা বেশি। তাঁরা আমার পেছনে অনেক ব্যয় করে। আমাকে তাই তাঁদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে হবে। আমাকে বেঁচেও থাকতে হবে। তা না হলে তাঁদের কোনো অবলম্বন থাকবে না। উল্টোভাবে মনে হয়, তাঁরা না থাকলে আমার কী হবে।’

এক সন্তান নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই সুলতানা মাহফুজার। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার পাশে জগন্নাথপুরে আজিজ সড়কে থাকেন তিনি। ছেলে ইয়াদ ইসলাম স্থানীয় প্রত্যয় আইডিয়াল স্কুলে প্লে-গ্রুপে পড়ে। আর কোনো সন্তান নেবেন না বলে জানালেন সুলতানা মাহফুজা। তিনি বলেন, ‘এই সন্তানের জন্মের সময় খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। আট ব্যাগ রক্ত লেগেছিল। এখনো প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়ি।’ এ কারণে স্বামী-স্ত্রী আর সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

মনোবিজ্ঞানীর ভাষায়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফারাহ্ দীবা বললেন, দেশে সন্তান লালন-পালনে নির্ভর করার মতো লোকজনের অভাব রয়েছে; বিশেষ করে ঢাকায় কর্মজীবী দম্পতিরা বেশি সমস্যায় পড়েন। এমন পরিবারগুলো বেশির ভাগই ঢাকার বাইরে থেকে এসেছে। তাঁদের পরিবারে সন্তানকে দেখভালের লোক থাকে না। বদ্ধ ঘরে গৃহকর্মীর ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে তাঁরা সন্তানের জন্য নিরাপদ বোধও করেন না।

মা-বাবা হওয়ার অদম্য আগ্রহ প্রাকৃতিক। প্রত্যেকেই জীবনে সন্তানের সাধ পূরণ করতে চান। তবে সন্তানকে একা বড় করার যে ঝক্কির মধ্য দিয়ে তাঁদের যেতে হয়, তাতে দ্বিতীয় সন্তানে তাঁরা আগ্রহ পান না। যেকোনোভাবে একটি সন্তান নিয়ে জীবনের পরিকল্পনা করে নেন তাঁরা।

একমাত্র সন্তানের একাকিত্ব অবশ্যই একটি ব্যাপার। সন্তান কোথায় থাকছে, কার কাছে থাকছে, সেটা তার বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। ফারাহ্‌ দীবা জানালেন, গবেষণায় দেখা গেছে, একমাত্র সন্তানের জ্ঞানগত ও সামাজিক বিকাশ দেরিতে হয়। বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তারা সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা থেকে পিছিয়ে থাকে। সাধারণত এ ধরনের সন্তানের জীবনে একা সমস্যার সমাধান করার প্রয়োজন হয় না বলে বন্ধুবান্ধব, সহপাঠী বা কারও সঙ্গে দ্বন্দ্ব হলে তা নিরসনের দক্ষতা অনেক ক্ষেত্রে তাদের তৈরি হয় না। মধুর সম্পর্ক দীর্ঘায়িত করার দক্ষতাও কম থাকে। তবে একা সন্তান মানেই জেদি ও স্বার্থপর হয়, এই মত সমর্থন করেন না এই মনোবিজ্ঞানী।

ভিন দেশে
‘সবেধন নীলমণি’ এক সন্তান নিয়ে মা-বাবা কী ভাবেন—তা জানতে পর্তুগাল, সুইডেন ও যুক্তরাজ্যে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন বিবিসির একজন প্রতিবেদক। সচিত্র প্রতিবেদনে যা তথ্য উঠে এসেছে, তার সঙ্গে এ দেশের দম্পতিদের চিন্তাভাবনার সাদৃশ্যই বেশি। পর্তুগালে ৫৯ শতাংশ পরিবারে ১৮ বছরের নিচের বয়সী এক সন্তান রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য দেশে গড়ে এক সন্তানের পরিবারের সংখ্যা ৪৭ শতাংশ।

এ তো গেল পর্তুগালের কথা। কিন্তু যেখানে সরকার থেকে আর্থিক সহায়তা পাওয়া যায়, সেখানকার কী অবস্থা? সুইডেনের মতো দেশকে মা-বাবার জন্য বিশ্বের সবচেয়ে আদর্শ জায়গা বলা হয়। এই সুইডেনেও ৩৯ শতাংশ পরিবারে এক সন্তান। সেখানে মায়ের পাশাপাশি বাবাও সন্তান জন্মের পর ছুটি পান। আছে সন্তানের জন্য ভাতা ও লালন-পালনে সরকারের অর্থসহায়তা। এরপরও সেখানে এক সন্তানের পরিবার তো কম নয়!

সুইডেনের থেরেসের চার বছর বয়সী আমোলি নামে এক মেয়ে রয়েছে। আর কোনো সন্তান না নেওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘আমি নিজস্ব জীবনযাপনের কারণেই এক সন্তান নিয়েছি। এতে কাজ করার সুযোগ বেশি। যা করতে চাই, তা-ই পারি।’

বিবিসির এ প্রতিবেদনটি যিনি করেছেন, তিনি ব্রিটিশ তরুণী হ্যারিয়েট নোবেল। নিজেও একমাত্র সন্তান। তিনি কেন একমাত্র সন্তান—এমন প্রশ্ন করেছিলেন মা-বাবাকে। বাবা তাঁকে জানান, তাঁর যখন মাত্র তিন বছর বয়স, তখন মা-বাবা দ্বিতীয় সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করেন। তবে ঠিক ওই সময়ে আর্থিক সংকটে পড়ার কারণে দ্বিতীয় সন্তান নেওয়ার ইচ্ছে থেকে তাঁরা সরে দাঁড়ান। তবে বাবার চেয়ে অনেক আবেগী জবাব দিয়েছিলেন হ্যারিয়েটের মা। মেয়ের হাত ধরে বলেছিলেন, ‘কখনো যে আমার এমন ভাবনা আসেনি তা নয়। পাশাপাশি এ-ও ভেবেছি, আমার তোমার মতো দারুণ এক মেয়ে রয়েছে। আমরা এত চমৎকার সময় কাটাই। এর চেয়ে ভালোভাবে আর কীভাবে জীবন কাটানো যেতে পারে।’

চীন–জাপানের অভিজ্ঞতা
এক সন্তান নেওয়া বা সন্তান না নেওয়া যে সমস্যা হয়ে উঠতে পারে, তা জাপানের চিত্র দেখলে বোঝা যায়। রয়টার্স ও দ্য ইকোনমিস্ট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপানে ১০০ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে গত বছর সবচেয়ে কমসংখ্যক শিশু জন্মেছে সে দেশে। গত বছর জন্ম নেয় ৯ লাখ ৪১ হাজার শিশু। ২০১৬ সালের তুলনায় এ হার ৪ শতাংশ কম।

চীনে ১৯৭৯ সালে এক সন্তান নীতি গ্রহণ করা হয় জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ঠেকিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে নজর দিতে। তবে নানা সমালোচনার মুখে এই নীতি সংশোধনে বছরের পর বছর কাজ করে দেশটির সরকার। ২০১৬ সালে এক সন্তান নীতি থেকে সরে বিবাহিত দম্পতিদের জন্য দুই সন্তান নীতি কার্যকর করে চীন সরকার।

শর্টলিংকঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।