আগামী সপ্তাহেই বিএনপির নতুন কর্মসূচি

 অনির্বাণ নিউজ ডেস্ক ● বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আবারও ‘অবস্থান’ কর্মসূচি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বিএনপি। কর্মসূচিতে ধারাবাহিকতা আনতেই তৃতীয় দফায় অনশনের পর দ্বিতীয় দফায় অবস্থান কর্মসূচি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। নতুন করে এই অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা আগামী সপ্তাহের শুরুর দিকেই দেওয়া হতে পারে।

বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, একাদশ জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই খালেদা জিয়ার মুক্তি নিশ্চিত করতে চায় বিএনপি। সেই লক্ষ্যে দাবি আদায়ে আগামী দিনের আন্দোলন জোরদার করতে দলটির ভাইস চেয়ারম্যান ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শক্রমে এবং তৃণমূলের নেতাকর্মীদের চাওয়াকে প্রাধান্য দিতেই মূলত এ কর্মসূচির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম (স্থায়ী কমিটি)।

নতুন কর্মসূচির বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রিয়.কমকে বলেন, ‘খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে নতুন করে কোনো কর্মসূচি নয়, বরং মিথ্যা মামলায় উনি (খালেদা জিয়া) কারাবন্দী হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে দলটির নেতাকর্মীরা। এরই ধারাবাহিকতায় সাধারণত কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়, হচ্ছে। তা ছাড়া গত ৮ মার্চ দলের পক্ষ থেকে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। যদিও সেই অবস্থান কর্মসূচি পুলিশি বাধায় নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই শেষ করতে হয়েছে। তারপরও অবস্থান কর্মসূচিতে যোগ দেওয়া বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে পুলিশ গ্রেফতার করে।’

এক প্রশ্নের জবাবে খন্দকার মোশাররফ বলেন, ‘বর্তমান অনির্বাচিত সরকার জনগণের আওয়াজ শুনলেই ভয়ে কেঁপে ওঠে। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিএনপির নেতাকর্মীদের হয়রানি করার জন্য লেলিয়ে দিচ্ছে। একটি মানববন্ধন কিংবা ঘরোয়া পরিবেশে আলোচনা সভা করতে বিরোধী দলগুলোকে অনুমতি নিতে হচ্ছে। পক্ষান্তরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলো ঢাকঢোল পিটিয়ে সভা, সমাবেশ ও মিছিল করে যাচ্ছে। আর দেশে রাজনৈতিক দলগুলো সভা সমাবেশ করতে পারবে না—এমন নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও বিএনপিকে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে নানান শর্ত জুড়ে দেওয়া হচ্ছে।’

‘তারপরও বিএনপি রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে খালি হাতে দাবি আদায়ে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করে যাচ্ছে। এর মূল শক্তিই হচ্ছে জনগণ। সেখানে বিএনপির রাজনীতি সরকারের অনুমতির ফ্রেমে আটকে আছে বলাটা শোভনীয় নয়। তা ছাড়া আন্দোলন যেহেতু বলে-কয়ে সময়-ক্ষণ নির্ধারণ করে সংগঠিত হয় না, তেমনি আন্দোলন কর্মসূচিতে ভিন্নতা আসতেও খুব একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয় না।’

‘খণ্ড খণ্ড আন্দোলন কর্মসূচি পালনের মধ্যে দিয়ে যখন বিএনপি চূড়ান্ত আন্দোলনের দিকে অগ্রসর হবে, তখন অটোমেটিক্যালি আন্দোলনের ধরন ও কৌশল পরিবর্তন করা হবে। সে ক্ষেত্রে সরকারকে নির্বাচনি পরিবেশ সৃষ্টিতে নেতাকর্মীদের স্বেচ্ছায় কারাবরণ কিংবা ঘেরাও কর্মসূচির চেয়েও কঠোরতর কর্মসূচি দেওয়া হতে পারে।’

গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে রাজধানীর নাজিমুদ্দিন রোডে ঢাকার সাবেক কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। খালেদা জিয়া কারাবন্দী হওয়ার শুরু থেকেই বিএনপির নেতারা তাদের প্রতিবাদ কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে রাজনৈতিক প্রতিবাদ বলে অভিহিত করেছেন। খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে এ পর্যন্ত বিএনপির পালিত কর্মসূচিগুলোর মধ্যে বিক্ষোভ মিছিল, প্রতিবাদ সমাবেশ, প্রতীকী অনশন, অবস্থান কর্মসূচি, মানববন্ধন, কালো পতাকা প্রদর্শন, গণস্বাক্ষর অভিযান, বিভাগীয় শহরে জনসভা, কালো ব্যাজ, জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি প্রদান অন্যতম।

এদিকে ১২ সেপ্টেম্বর প্রতীকী অনশনে নতুন কর্মসূচির প্রতি ইঙ্গিত করে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, ‘এই সরকার খালেদা জিয়ার মুক্তি চায় না। আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার মুক্তি হবে বলে আমারও মনে হয় না। তাই স্পষ্ট করে বলছি, সময় আসছে। আর সময় বেশি দেরি নাই। সময় মাত্র মাস খানেক। এমন কর্মসূচি দেওয়া হবে, যে কর্মসূচিতেই এই সরকারের নৌকা ভেসে যাবে। কারণ রাজপথের আন্দোলনই খালেদা জিয়ার মুক্তির একমাত্র পথ। ইনশাআল্লাহ, খালেদা জিয়াকে আন্দোলনের মাধ্যমেই কারামুক্ত করবে বিএনপি।’

বিএনপি নেতাদের দাবি, খালেদা জিয়া কারাবন্দী হওয়ার পরও নেতাকর্মীদের নতুন নতুন মামলায় হয়রানি ও গ্রেফতার থেমে নেই। ইতোমধ্যে রাজধানীতে ভিন্ন ব্যানারে বেশ কয়েকটি বড় ধরনের গণজমায়েত করে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তিও জানান দিতে পেরেছেন তারা। যারই আলোকে খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে চূড়ান্ত আন্দোলনে নামার আগে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ওই বিশাল জনসভা ও সর্বশেষ গত ১০ সেপ্টেম্বর মানববন্ধনটিও বিএনপিকে আন্দোলনের ক্ষেত্রে অনেকটাই বাড়তি আত্মবিশ্বাস যুগিয়েছে। দলটির নীতি-নির্ধারকরা বলেছেন, চেয়ারপারসনের সাময়িক অনুপস্থিতিতে তারা (বিএনপি) এখন সরকারকে বিদায় করতে যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য প্রিয়.কমকে বলেন, ‘বিএনপির লক্ষ্য হচ্ছে ধীরে ধীরে সারাদেশে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে রাজপথে আন্দোলনে নেমে পড়া। ফলশ্রুতিতে ইস্যুভিত্তিক প্রতিটি কর্মসূচিকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেই ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’

‘শুধু তা-ই নয়, বিএনপি খুব শিগগির খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে নির্বাচনি প্রচারণাও শুরু করবে। উদ্দেশ্য সরকারকে চাপে রেখে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন দিতে বাধ্য করা। সে জন্য যদি বিএনপিকে সরকারবিরোধী অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হতে হয়, জোটবদ্ধও হবে। নতুবা স্ব স্ব অবস্থান থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘জাতীয় ঐক্য গঠনে জামায়াতে ইসলামীর সম্পৃক্ততা না থাকলেও জামায়াতে ইসলামী বিএনপি নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোটের শরিক দল। সে ক্ষেত্রে বিএনপি যদি স্ব স্ব অবস্থানে থেকেও রাজপথের আন্দোলনে নেমে পড়ে তখন জামায়াতে ইসলামী তো পাশাপাশি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। বরং না থাকাটা হবে জামায়াতের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।’

‘যদিও বিএনপি খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে ২০ দলীয় জোট একাদশ নির্বাচনে যাবে কি না তা নিয়ে কিছুটা সংশয় ও দ্বিধা থাকছে। তারপরও চেয়ারপারসনের মুক্তি ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন—এ দুই ইস্যুতে আন্দোলনের রোডম্যাপ চূড়ান্ত করা হচ্ছে। সেই আন্দোলনে পাশে থাকবে ২০ দলীয় জোট। সে জন্য এবারই প্রথম তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে এ রোডম্যাপ চূড়ান্ত করা হচ্ছে। যাতে করে চূড়ান্ত আন্দোলনে সবাইকে একত্রে সম্পৃক্ত করা যায়।’

এদিকে ১২ সেপ্টেম্বর, বুধবার খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিএন‌পির প্রতীকী অনশন কর্মসূচিতে সমর্থন জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মিয়া গোলাম পরওয়ার সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘খা‌লেদা জিয়ার মু‌ক্তিসহ রাজপ‌থে সব আ‌ন্দোলন কর্মসূ‌চি‌তে বিএন‌পি নেতৃত্বাধীন জো‌টের অংশ হি‌সে‌বে জামায়াতে ইসলামী পাশে থাক‌বে।’

মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও ব‌লেন, ‘প্রধানমন্ত্রী দেশ‌নেত্রী খা‌লেদা জিয়া‌কে কারাগা‌রে রে‌খে নির্বাচন থে‌কে দূ‌রে রাখ‌তে চাচ্ছেন। তা‌কে কারাগা‌রে রে‌খে বিভ্রা‌ন্তি ছড়া‌চ্ছেন। সে জন্য মামলায় জা‌মিন পাওয়ার পর তা‌কে মু‌ক্তি দেওয়া হ‌চ্ছে না। আমা‌দের বক্তব্য খুব প‌রিষ্কার, ‌দেশ‌নেত্রী‌কে কারাগা‌রে রে‌খে বাংলা‌দে‌শে কোনো নির্বাচন হ‌বে না। নির্বাচন হ‌তে দে‌বে না জনগণ।’

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আপাতত বিএনপির পক্ষ থেকে তেমন কোনো নতুন কর্মসূচি নাই। যা ঘোষণা করা হবে, সেটি ধারাবাহিক কর্মসূচিরই অংশমাত্র।’

শর্টলিংকঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *